Thursday, 3 May 2018


কিছু মূল্যবান তথ্য (সংগৃহীত)

·      দুইপক্ষ - কৃষ্ণপক্ষ, শুক্লপক্ষ।
·      দুই অয়ণ=উত্তরায়ণ,,দক্ষিণায়ন।
·      ত্রি ভুবন স্বর্গ, মর্ত, পাতাল।
·      ত্রিফলা - হরীতকী, বিভীতকী বা বহেড়া, আমলকী।
·      ত্রিধারা - মন্দাকিনী, অলকানন্দা,ভোগবতী।
·      ত্রিশক্তি - কালী, তারা, ত্রিপুরা।
·      ত্রিকাল - অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ।
·      ত্রিকুল - পিতৃকুল, মাতৃকুল, শ্বশুরকুল।
·      ত্রিবেণী - গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী।
·      ত্রিপিটক - সূত্র, বিনয়, অভিধর্ম।
·      ত্রিরত্ন - বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ।
·      ত্রিবর্গ - ধর্ম, অর্থ, কাম।
·      গরমমশলা - দারুচিনি, লবঙ্গ, ছোটো এলাচ।
·      চারবেদ - ঋক, সাম, যজু, অথর্ব।
·      চারযুগ - সত্য, ত্রেতা দ্বাপর, কলি।
·      চতুর্বর্গ - ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ।
·      চতুরঙ্গ সেনা - হস্তী, অশ্ব, রথ,পদাতিক।
·      চতুর্ধাম - রামনাথ, বৈদ্যনাথ, জগন্নাথ,
·      দ্বারকানাথ।
·      চতুরাশ্রম - ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য,বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস।
·      চতুর্বর্ণ - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র।
·      পঞ্চবাণ - সম্মোহন, উন্মাদন, শোষণ,তাপন, স্তম্ভন।
·      পঞ্চগঙ্গা - ভাগীরথী, গোমতী,কৃষ্ণবেণী, পিনাকিনী, কাবেরী।
·      পঞ্চনদী - কিরণা, ধূতপাপা, সরস্বতী, গঙ্গা, যমুনা।
·      পঞ্চনদ - ঝিলম বা বিতস্তা, চন্দ্রভাগা,ইরাবতী, বিপাশা, শতদ্রু।
·      পাঁচফোড়ন - মৌরি, মেথি,কালোজিরে,জিরে, রাঁধুনি।
·      পঞ্চধান্য - শালি, ব্রীহি, শূক, শিম্বি, ক্ষুদ্র।
·      পঞ্চবটী - অশ্বত্থ, বট, বিল্ব, আমলকী,অশোক।
·      পঞ্চপ্রাণ - প্রাণ, অপান, সমান, উদান,ব্যান।
·      পঞ্চমুক্তি - সার্ষ্টি, সারূপ্য, সালোক,সাযুজ্য, নির্বান।
·      পঞ্চতীর্থ - কুরুক্ষেত্র, গয়া, গঙ্গা,প্রভাস, পুষ্কর।
·      পঞ্চতিক্ত - নিম, গুলঞ্চ, বাসক, পলতা,কন্টকারী।
·      পঞ্চনুন - সৌর্বচল, সৈন্ধ, বিট, ঔদ্ভিদ,সামুদ্রিক।
·      পঞ্চগুণ - রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ।
·      পঞ্চগব্য - দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোমূত্র, গোময়।
·      পঞ্চভুত - ক্ষিতি, অপ্, তেজঃ, মরুত,ব্যোম।
·      পঞ্চ ’ - কেশ বা চুল, কাঙ্গা বাচিরুনি, কড়া বা কঙ্কণ বা বালা, কৃপাণবা ছুরি, কাশেরা।
·      পঞ্চ '' - মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন।
·      পঞ্চরত্ন - নীলকান্ত, হীরক, পদ্মরাগ,মুক্তা, প্রবাল।
·      পঞ্চশস্য - ধান, যব, মাষ, তিল, মুগ।
·      পঞ্চামৃত - দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, মধু, চিনি।
·      পঞ্চায়ুধ - তরবারি, শক্তি, ধনুক, বর্ম,পরশু বা কুঠার।
·      পঞ্চপল্লব - আম, অশ্বত্থ, পাকুড়, বট, যজ্ঞডুমুর।
·      পঞ্চোপচার - গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ,নৈবেদ্য।
·      পঞ্চপাণ্ডব - যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন,নকুল,সহদেব।
·      পঞ্চকন্যা - অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তি,তারা,মন্দোদরী।
·      পঞ্চ ইন্দ্রিয় - চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা,জিহ্বা, ত্বক।
·      পাঁচ মহাসাগর - প্রশান্ত মহাসাগর,ভারতমহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর,
·      সুমেরু বা উত্তর মহাসাগর, কুমেরু বাদক্ষিণ মহাসাগর।
·      পঞ্চ ফুলশর - অরবিন্দ, অশোক,নবমল্লিকা, শিরীষ, নীলোৎপল।
·      ছয়ঋতু - গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত,বসন্ত।
·      ষড়ঙ্গ - দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোমূত্র, গোময়,গোরোচনা।
·      ষড়রস - কটু, তিক্ত, কষায়, লবণ, অম্ল,মধুর।
·      ষড়রিপু - কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ,মাৎসর্য।
·      ষটচক্র - মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপূরক,অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা।
·      ষটকর্ম - যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপনদান, প্রতিগ্রহ।
·      সাতসমুদ্র - লবণ, ইক্ষুরস, সুরা, ঘৃত, দধি,
·      ক্ষীর, স্বাদূদক।
·      সাত মহাদেশ - এশিয়া, আফ্রিকা,ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণআমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া,অ্যান্টার্কটিকা।
·      সপ্তস্বর্গ ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বলোক,জনলোক, মহর্লোক বা মহোলোক,তপর্লোক, সত্যলোক।
·      সপ্তপাতাল অতল, বিতল, সুতল,তলাতল, মহাতল, রসাতল, পাতাল।
·      সপ্তধাতু(আয়ুর্বেদ)- বায়ু, পিত্ত, কফ,রক্ত, শুক্র, মাংস, অস্থি।
·      সাতবার - সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি,শুক্র, শনি, রবি।
·      সপ্তদ্বীপ (পৌরাণিক) - জম্বু, কুশ,প্লক্ষ,শাল্মলী, ক্রৌঞ্চ, শাক, পুষ্কর।
·      সপ্তর্ষি মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ,পুলস্ত্য, ক্রতু, বশিষ্ঠ।
·      সুরসপ্তক - সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি।
·      সপ্তকাণ্ড রামায়ণ - আদি বা বাল,অযোধ্যা, অরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দরা,লঙ্কা বা যুদ্ধ, উত্তরা।
·      সপ্তরথী - দ্রোণাচার্য, কর্ণ, কৃপাচার্য,অশ্বত্থামা, শকুনি, দুর্যোধন, দুঃশাসন।
·      অষ্টবসু - ধর, ধ্রুব, সোম, অনল, অনিল,সাবিত্র, প্রথূষ, প্রভাস।
·      অষ্টধাতু - স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিত্তল,কাংস্য, ত্রপু, সীসক, লৌহ।
·      অষ্টকাল - প্রাতঃ, পূর্বাহ্ণ, মধ্যাহ্ন,সায়াহ্ন, অপরাহ্ন, প্রদোষ, মধ্যরাত্রি,নিশান্তক।
·      অষ্টভৈরব - অসিতাঙ্গ, রুরু, চণ্ড,ক্রোধোন্মত্ত, ভয়ংকর, কপালী, ভীষণ,সংহার।
·      অষ্টকুলাচল (পৌরাণিক)- হিমালয়,মহেন্দ্র, মলয়, সহ্য, শক্তিমান, ঋক্ষ,বিন্ধ্য, পরিপাত্র বা পরিযাত্র।
·      অষ্টনাগ (পৌরাণিক) - বাসুকি বাভোগীন্দ্র, তক্ষক, অনন্ত, পদ্ম, মহাপদ্ম,কুলীর, কর্কট, শঙ্খ।
·      অষ্টসিদ্ধি - অণিমা, লঘিমা, গরিমা,প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ,মহিমা, ঈশিত্ব,বশিত্ব।
·      অষ্টদিগগজ - ঐরাবত, পুণ্ডরীক, বামন,কুমুদ, অঞ্জন, পুষ্পদন্ত, সার্বভৌম,সুপ্রতীক।
·      অষ্টনায়িকা - মঙ্গলা, বিজয়া, ভদ্রা,জয়ন্তী, অপরাজিতা, নন্দিনী,নারসিংহী, কৌমারী।
·      অষ্টধর্ম - সত্য, শৌচ, অহিংসা, অনসূয়া,ক্ষমা, অনৃশংস্য, অকার্পণ্য, সন্তোষ।
·      অষ্টগ্রহ - বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল,বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন।
·      নবগ্রহ (পৌরাণিক) - সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল,বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু, কেতু।
·      নবরত্ন - ধন্বন্তরি, ক্ষপণক, অমরসিংহ,শঙ্কু, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, কালিদাস,বরাহমিহির, বররুচি।
·      নবদুর্গা - শৈলপুত্রী বা পার্বতী,ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা,স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি,মহাগৌরী, সিদ্ধিদা।
·      নবরস - আদি বা শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ,রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত,শান্ত।
·      নব গুণ - আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা,তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, আবৃত্তি, তপ, দান।
·      নব শাখ - তাঁতি, মালাকার, সদগোপ,নাপিত, বারুই, কামার, কুমোর, তিলি,ময়রা।
·      একাদশরুদ্র - অজ, একপাদ, অতিব্রধ্ন,পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর,বৃষাকপি, শম্ভু, হর, ঈশ্বর।
·      বারোমাস - বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়,শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্ত্তিক,অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র।
·      বারো রাশিচক্র - মেষ, বৃষ, মিথুন,কর্কট,সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর,কুম্ভ, মীন।

Thursday, 29 March 2018

প্রসঙ্গঃ- বশিষ্ঠ মুনি ও বিশ্বামিত্র




ব্রহ্মার মানসপুত্র বশিষ্ঠ, অরুন্ধুতীর পতি এবং ইক্ষাকুকুলের পুরোহিত। অন্যদিকে কান্যকুব্জ দেশে কুশিকের পুত্র হলেন গাধি, তার পুত্র বিশ্বামিত্র ছিলেন সর্ব গুণ সম্পন্ন। বেদ, বিদ্যা, বুদ্ধিতে ভুবন বিখ্যাত।
একদিন তিনি সসৈন্য মৃগয়া করতে মহাবনে প্রবেশ করলেন। মৃগয়ায় শ্রান্ত রাজা ক্ষুধা-পিপাসায় পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। মনোহর স্থান দেখে রাজা খুশি হলেন। রাজাকে দেখে মুনি অতিথি সৎকারে মন দিলেন। রাজার সৈনিকদের পরিশ্রান্ত দেখে তিনি তার কামধেনু নন্দিনীকে ডেকে বললেন– দেখ রাজার সৈন্যরা আমার অতিথি। যে যা চাই তাই দিয়ে তাকে তুষ্ট করো।বশিষ্ঠ মুনির আজ্ঞা পেয়ে সুরভী সংসারে যা অদ্ভূত, তেমন কর্ম করল। হুঙ্কার দিয়ে নানা দ্রব্য আনলেন চর্ব্য-চষ্য-লেহ্য-পেয় নানা রত্ন ধন। বস্ত্র, অলঙ্কার, মালা, কুসুম, চন্দন, বিচিত্র পালঙ্ক আর বসার আসন। যে যা চাইতে লাগলো, তাই পেলো। সকল সৈন্য আনন্দিত হল। দরিদ্র মুনির এমন বিস্ময় কর্ম দেখে গাধির পুত্র বিশ্বামিত্র অবাক হলেন। বশিষ্ঠের কাছে গিয়ে বলেন– আমি আপনাকে এক কোটি গরু দান করবো, তাদের খুর সোনায় মন্ডিত করে দেব। তার পরিবর্তে এই ধেনু আমায় দিন। অথবা আপনি যদি চান আমি রাজ্যও দিতে রাজি আছি। হস্তী, অশ্ব, পদাতিক যত সৈন্য সব আপনাকে দেব এই ধেনুর পরিবর্তে।
বশিষ্ঠ বলেন– আমি কামধেনু দান করব না। এটি দেবতা ও অতিথিদের জন্য আমার কাছে আছে।
রাজা বললেন– মুনি, তুমি জাতে ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণদের এমন জিনিষের প্রয়োজন হয় না। এ কেবল রাজার ঘরেই সাজে। একে বনে নিয়ে তুমি কি করবে। নিজের ইচ্ছেতে ধেনু দান না করলে, আমি বল প্রয়োগ করে ছলে-বলে-কৌশলে একে অধিকার করবো।
বশিষ্ঠ বললেন- তুমি তোমার দেশে শ্রেষ্ঠ, তাও সৈন্য সামন্ত নিয়ে। যা ইচ্ছে তুমি করে দেখ। আমি তপস্বী- আমার আর কি শক্তি! শুনে বিশ্বামিত্র সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন – কামধেনু সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চল। শুনে সৈন্যরা কামধেনুর গলায় দড়ি বেঁধে পিছনে বাড়ী মেরে মেরে নিয়ে চললো। প্রচন্ড মার খেয়েও কামধেনু নড়ল না। সজলাক্ষে ব্যাকুল ভাবে মুনির মুখের পানে চেয়ে রইলো।
মুনি বললেন – নন্দিনী, আমার কাছে তুমি কি চাও। আমার সামনে তোমার এত কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমি সামান্য তপস্বী ব্রাহ্মণ, আমি আর কিবা করতে পারি তোমার জন্য। রাজা বল প্রয়োগ করে তোমায় নিয়ে যেতে চায়। 
সে সময় রাজার সৈন্যরা কামধেনুর সন্তান ছোট্ট বাছুরটিকে ধরে গলায় দড়ি বেঁধে আগে আগে টেনে নিয়ে চললো। সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে কামধেনু নন্দিনী ডাক ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মুনিকে বলল – ভগবান, বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের কশাঘাতে অনাথা আমি ও আমার সন্তান বিলাপ করছি। আপনি তা উপেক্ষা করছেন কেন! আমি কি করবো আজ্ঞা করুন।
মুনি দুঃখিত হয়ে বলেন – ক্ষত্রিয়ের বল তেজ, ব্রাহ্মণের বল ক্ষমা। কল্যাণী, আমি তোমায় ত্যাগ করিনি। নিজের শক্তিবলে যদি থাকতে পার, তবে আমার কাছেই থাক, এর বেশি আর কি বলবো।
মুনির মুখে একথা শোনা মাত্র পয়স্বিনী(দুগ্ধবতী গাভী) কামধেনু ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। ঊর্দ্ধমুখে গাভী হাম্বা রবে ডাক ছেরে শরীর বাড়াতে লাগল এবং বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের তাড়াতে লাগলো। তার বিভিন্ন অঙ্গ থেকে নানাজাতির সৈন্য লাখে লাখে বের হল। পুচ্ছ থেকে পহ্লব নামে জাতি নানা অস্ত্র হাতে তেড়ে এল। মূত্রে জন্ম হল বহু ব্যাধের। দুই পাশ থেকে জন্ম নিল কিরাত ও যবন। মুখের ফেণা থেকেও অনেক সৈন্যের জন্ম হল। চারি পা হতে নানাজাতির ম্লেচ্ছরা জন্ম নিল। সকলে নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের তাড়া করল। দুই দলের সৈন্যদের প্রচন্ড যুদ্ধ হল। বিশ্বামিত্রের একজন সৈন্যের বিরুদ্ধে মুনির পাঁচজন সৈন্য হল। সহ্য করতে না পেরে বিশ্বামিত্রের সৈন্যরা রণে ভঙ্গ দিল। রাজার সামনেই তারা পালাতে লাগল। অনেক সৈন্য রক্তের নদীতে আহত হয়ে পড়ে রইল। এভাবে মুনির সৈন্য রাজার সৈন্যদের পিছনে পিছনে দৌড়ে তাদের বিতাড়িত করল। মুনির সৈন্য বিশ্বামিত্রকেও বনের বাইরে পাঠিয়ে মুনিকে এসে প্রণাম করল।এরপর বিধ্বস্ত বিশ্বামিত্র সৈন্যবিহীন অবস্থায় ও শতপুত্র হারানোর শোকে কাতর হয়ে রাজধানীতে ফিরে এসে তাঁর শেষ একমাত্র পুত্রের কাঁধে রাজ্যের শাসনভার দিয়ে বনে গমন করেন ও মহাদেবের কঠোর তপস্যা শুরু করেন। মহাদেব বিশ্বামিত্রের তপস্যায় অতি সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রদানে উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র তার নিকট থেকে মন্ত্রসহ সাঙ্গোপাঙ্গ ধনুর্বেদ সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে নেন। পরে তিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে পুণরায় গমন করে তপোবন নষ্ট করে ফেলেন এবং পরে ঋষিবরের উপর পুণরায় অস্ত্রবর্ষণ করতে শুরু করেন। বশিষ্ঠদেব তখন ব্রহ্মদণ্ড হাতে নিয়ে বিশ্বামিত্রের সমস্ত অস্ত্রের মোকাবেলা করেন ও বিশ্বামিত্রকে নিরস্ত্র করেন।এতে বিশ্বামিত্রের মনে ভীষণ অভিমানের সৃষ্টি হয়। হতমান ও হতদর্প বিশ্বামিত্র উপলদ্ধি করেন যে অস্ত্রবলের চেয়ে ব্রহ্মবলের শ্রেষ্ঠত্ব অনেক বেশী এবং তাই নিজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য তিনি দক্ষিণে গমন করেন ও কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন।
বিশ্বামিত্রের দীর্ঘকালের কঠোর তপস্যায় পরিতুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তার কাছে আসেন ও ঋষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু তাতেও বিশ্বামিত্র পরিতুষ্ট না হয়ে পুণরায় উগ্র তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন। এ সময়ে ইন্দ্রের নির্দেশে অপ্সরারূপী মেনকা ঋষিবরকে তার রূপে বিমোহিত করতে সক্ষম হন এবং তার সাথে দশ বৎসর যাপন করেন। এই দশ বৎসর স্বামীর সহিত মেনকার সংসার কালে বিশ্বামিত্র’র ঔরসে মেনকার গর্ভে শকুন্তলা নামে এক কন্যার জন্ম হয়। দশ বৎসর পরে চৈতন্য ফিরে পাওয়ায় বিশ্বামিত্র মেনকাকে বিদায় দিয়ে অতি বিষণ্নচিত্তে উত্তরদিকে গমন করেন এবং হিমাচলে কৌশিকী নদীর তীরে পুণরায় কঠোর তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন।দীর্ঘকাল পরে ব্রহ্মা বিশ্বামিত্রের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে মহর্ষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু ব্রহ্মা তাকে বললেন, ‘তোমার সিদ্ধিলাভের বহু বিলম্ব আছে, কারণ তুমি এখনও ইন্দ্রিয় জয় করতে পার নাই’। এ কথা শুনে মহর্ষি পুণরায় উগ্র তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন। এ সময়ে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করার লক্ষ্যে দেবরাজের আদেশে অপ্সরাঃ রম্ভা সমাগতা হলে মহর্ষি তাকে শাপ প্রদানে দীর্ঘকালের নিমিত্ত পাষাণাকারে পরিণত করেন। পরন্তু ক্রোধের কারণে তপঃফল নষ্ট হওয়ায় বিশ্বামিত্র পূর্বদিকে গিয়ে তপস্যা করতে লাগলেন। বহুবর্ষ পরে ব্রহ্মা উপস্থিত হয়ে তাকে ব্রাহ্মণত্ব প্রদান করেন। বিশ্বামিত্র ব্রহ্মর্ষিত্ব সাধে করে দীর্ঘ পরমায়ুঃ, চতুর্বেধ এবং ওঙ্কার লাভ করে মনোরথ-সিদ্ধি হওয়ায় আনন্দ-সাগরে নিমগ্ন হলেন।এতসব প্রাপ্তির পরও বিশ্বামিত্রের মনে সবসময় বশিষ্ঠের অপমানের কথা ঘুরতে লাগলো, তিনি মনে মনে বশিষ্ঠমুনিকে কি ভাবে সাজা দেওয়া যায় তার উপায় খুজতে লাগলেন। এদিকে কল্মাষ্পাদ নামে ইক্ষবাকু বংশে অতি জ্ঞানী ও গুণী এক রাজা ছিলেন আর মহামুনি বশিষ্ঠ ছিলেন তারই পুরোহিত। রাজা একমহা যজ্ঞের আয়োজন করে বশিষ্ঠকে তার হোতা হতে আহবান করেন, কিন্তু বশিষ্ঠ মুনি তখন দেবরাজ ইন্দ্রের যজ্ঞে নিয়োজিত থাকায় রাজাকে কিছুকাল অপেক্ষা করতে বলেন কিন্তু অধীর রাজন তাতে সম্মত হলেন না। যথাকালে যজ্ঞের আয়োজন তিনি করেন কিন্তু মুনি না আসায় রাজার মনে ভীষন ক্রোধের সঞ্চার হয় এবং তিনি বিশ্বামিত্র কে আমন্ত্রন করে নিয়ে আসেন। পথে বশিষ্ঠের পুত্র শক্তির সাথে দেখা হয়। ক্রোধান্বিত রাজা মুনি পুত্রকে বলেন যে এটা রাজপথ আর যজ্ঞের কারনে তাকে সত্ত্বর রাজধানীতে পৌঁছানোর প্রয়োজন তাই পথ ছেড়ে দিতে। এদিকে মুনিপুত্র রাজাকে বলেন যে বেদের বিধান অনুযায়ী এ দ্বিজ পথ তাই রাজা আগে মুনিকে পথ ছাড়া উচিত।এই দুজনের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়।একসময় রাজা মুনিপুত্রের গায়ে আঘাত করে ফেলেন, এতে শক্তির শরীর দিয়ে প্রচন্ড রক্তপাত হতে থাকে, মুনিপুত্র এতে ক্রুদ্ধ হয়ে রাজাকে নিশাচর হয়ে মানুষের মাংস ভক্ষক হয়ে তা দিয়ে উদর পুর্তির অভিশাপ দেন।

শাপিত রাজা তখন এক ভয়ানক রাক্ষসে পরিনত হন, এইসব দেখে ভীত বিশ্বামিত্র সেই স্থান থেকে অন্তর্হিত হয়ে যান। রাক্ষসে পরিনত রাজা তখন হাতের সম্মুখে মুনিপুত্র শক্তিকে বধ করে ভক্ষণ করে ফেলেন। এই ভাবে কিছুকাল রাক্ষস হয়ে বনে বনে ভ্রমন করতে থাকেন।একবার বিশ্বামিত্র সেই রাক্ষস কে নিয়ে সেই বনের ভিতরে যান যেখানে বশিষ্ঠের শতপুত্র বাস করতো, আর সেই রাক্ষস তখন একে একে সকল মুনিপুত্র কে হত্যা করে ভক্ষন করে নেয়। এদিকে বশিষ্ঠ ফিরে এসে শূন্যগৃহ দেখে হতবিহ্বল হয়ে পরেন অবশেষে ধ্যান বলে জানতে পারেন যে এ সব বিশ্বামিত্রের ছলনার ফল। গভীর পুত্রশোকে তিনি আত্মত্যাগের সঙ্কল্প নেন ও তিনি তার জন্যে সমুদ্রের ভিতরে প্রবেশ করেন কিন্তু সমুদ্রদেব মুনিবরকে সমুদ্রের কূলে রেখে দেন। সমুদ্রের জলে মৃত্যু না হওয়ায় তিনি এক উচ্চ পর্ব্বতের উপর থেকে ঝাঁপ দেন কিন্তু সেই মুহুর্ত্তে নীচের ধরনী তুলারাশি তে পরিনত হুয়ে যায় ফলে তাঁর তাতেও মৃত্যু হয় নি।তারপরে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করেন কিন্তু মুনির স্পর্শে আগুনের তাপ শীতল হয়ে পরে।অবশেষে তিনি শ্বাপদসঙ্কুল গহন বনে প্রবেশ করেন হিংশ্র জন্তুদের ভক্ষ্য হতে কিন্তু মুনিকে দেখা মাত্র সকল বন্য জন্তুরা পালিয়ে যায়। ঘুরতে ঘুরতে মুনি এক গভীর নদীর তীরে আসেন যেখানে লক্ষ লক্ষ ভয়ঙ্কর কুমীর ছিল, মুনি সেখানে ঝাঁপ দিতে গেলে তাঁর কানে বেদমন্ত্রের ধ্বনি আসে, সেই মন্ত্রের ধ্বনি অনুসন্ধান করে তিনি তাঁর পুত্রবধু অদৃশ্যন্তীকে দেখতে পান। তাঁর পুত্রবধূ একমনে বেদমন্ত্র উচ্চারন করে চলছেন।... মুনি বশিষ্ঠ শুধুমাত্র পুত্রবধুকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন কারন তাঁর কানে পুত্রবধূর কণ্ঠস্বর ছাড়া আরেকজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন যা কিছুটা তাঁর পুত্র শক্তির মতো ছিল, তিনি তাঁর পুত্রবধুকে তাঁর এই কৌতূহল মিটানোর ব্যবস্থা করতে বলেন। মুনির এই প্রশ্নের উত্তরে অদৃশ্যন্তী বলেন যে শক্তির পুত্র তাঁর গর্ভে এবং সেই কণ্ঠস্বর সেই গর্ভস্থ সন্তানেরই। এই শুনে বশিষ্ঠ মুনি যারপরনাই খুশি হলেন, খুশি হলেন এই ভেবে যে তাঁর পুত্র না থাকলেও তাঁর বংশধর আছে। তিনি পুত্রবধূকে নিয়ে আশ্রমে প্রত্যাবর্তনের সময় সেই রাক্ষস রাজার সাথে দেখা হয়, বশিষ্ঠ মুনিকে দেখে রাক্ষসরূপী রাজা কল্মাষ্পাদ মুনিকে গিলতে ধেয়ে আসে।তা দেখে অদৃশ্যন্তী ভয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকেন, মুনিবর তাঁকে অভয় দিয়ে বলেন যে এ রাক্ষস নয় এ অভিশপ্ত এক রাজা। মুনি এই বলে হাতের কমণ্ডলু থেকে সেই রাক্ষসের উপর জল ছিটিয়ে দিলেন এবং এতে রাক্ষসের শরীর থেকে রাজা বেরিয়ে আসলেন...। মুনিকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে রাজা মুনিকে প্রণাম করে তাঁর আশির্বাদ প্রার্থনা করেন। বশিষ্ঠ তাঁকে আশির্বাদ করে রাজধানীতে ফিরে রাজপাট পুনঃ গ্রহনের আদেশ করেন। অতপর মুনি তাঁর পুত্রবধূকে নিয়ে আশ্রমে ফিরে আসেন। যথাসময়ে অদৃশ্যন্তী এক পুত্রের জন্ম দেন জ্যোতিষ বিচার করে তাঁর নাম রাখা হয় পরাশর। অতিযত্নে মুনি তাঁর পৌত্রকে লালন পালন করতে থাকেন, নানা বিদ্যায় পরাশর অতি অল্প বয়ষে পারদর্শী হয়ে উঠেন। এদিকে পরাশর বশিষ্ঠকে আপন পিতা হিসেবে ভ্রম করলে অদৃশ্যন্তী ছেলেকে তাঁর আসল পরিচয় বলেন। পিতার ভয়াবহ মৃত্যুর কথা জানতে পেরে ক্রোধে পরাশর কাঁপতে থাকেন এবং পিতার হত্যাকারীর বিনাশের সঙ্কল্প নেন, এই সব দেখে মুনি পৌত্রকে প্রবোধ দিয়ে বলেন যে ব্রাহ্মণের ধর্ম্ম এই নয়, ক্ষমা শান্তি হল ব্রাহ্মণের ধর্ম এবং এই হল বেদের বিহিত।। তিনি এও বলেন যে এই সংসারে যে যার কর্মফল ভোগ করে এবং সেই অনুযায়ী তাঁর পিতারও এই পরিনতি হয়। তাই তিনি পরাশরকে এইসব প্রতিহিংসা পরিত্যাগ করে আবার শাস্ত্র অধ্যয়নের পরামর্শ দেন। পরাশর ও সেই অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করে জগতে নিজের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করেন

Friday, 19 January 2018

সরস্বতী পূজা

ছবি সুত্রঃ-ইন্টারনেট(গুগল)




আর দুদিন পরেই আসছে শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা...।সনাতন ধর্মাবলম্বী দের কাছে এ এক বিশেষ দিন... বিশেষতঃ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে...। এই সরস্বতী দেবী কে/ কি বা তাঁর পরিচয়? তার সামান্য তথ্য সংগ্রহ করে আজকে আমার এই প্রতিবেদন...।
যে দেবী সরস্বতীকে হিমালয়কন্যা পার্বতীর কন্যা ও লক্ষ্মী-কার্তিক-গণেশের সহোদরা ভগ্নীরূপে আমরা জানি বা শুনে আসছি , এর পিছনে কিন্তু কোন শাস্ত্রীয় অনুমোদন নেই। সরস্বতী সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার সহধর্মিণী এবং বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মী ও মহেশ্বরজায়া পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিতা। সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। সরস্বতী শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে সরস+বতু আর স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে সরস্বতী। তিনি বিদ্যাদেবী, জ্ঞানদায়িনী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিতা। তাঁর এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক।সরস্বতী প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদসমূহের প্রসূতি। ঋগ্বেদে বাগদেবী, ত্রয়ীমূর্তি - ভূ: ভুব: স্ব:, জ্ঞানময়ীরূপে সর্বত্রব্যাপিনী। বিশ্বভূবন প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন প্রজ্বলিত হয়, তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার যায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বত্র তখন জ্বলতে থাকে জ্ঞানের পুণ্য জ্যোতি। এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক বাগ্দেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগ্বেদে তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন। কল্যাণময়ী নদীতটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে ও সাধনে নিমগ্ন হতো। তাদের কণ্ঠে উদ্গীত সাম সঙ্গীতের প্রতীকী বীণা দেবীর করকমলে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতে আশ্রমবাসী ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী 'পুস্তক হস্তে', গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তাঁর সঙ্গে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে শ্রীশ্রীচণ্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভূজা - বাণ, কার্মূক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘন্টা ছিল তাঁর অস্ত্র। তাঁর এই সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবটি হানি ঘটেনি, কেননা তিনি 'একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা' বলে মোহদুষ্ট শুম্ভকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করেছিলেন। স্কন্দ পুরাণে প্রভাসখণ্ডে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনী বর্ণিত আছে। বায়ু পুরাণ অনুযায়ী কল্পান্তে সমুদয় জগৎ রুদ্র কর্তৃক সংহৃত পুনর্বার প্রজাসৃষ্টির জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজ অন্তর থেকেই দেবী সরস্বতীকে সৃষ্টি করেন। সরস্বতীকে আশ্রয় করেই ব্রহ্মার প্রজাসৃষ্টি সূচনা। গরুড় পুরাণে সরস্বতী শক্তি অষ্টবিধা। শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও স্মৃতি। তন্ত্রে এই অষ্টশক্তি যথাক্রমে যোগ, সত্য, বিমল, জ্ঞান, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা। তন্ত্র শাস্ত্রমতে সরস্বতী বাগীশ্বরী - অং থেকে ক্ষং পঞ্চাশটি বর্ণে তাঁর দেহ। আবার পদ্মপুরাণ-এ উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে –
শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা
এর অর্থ দেবী সরস্বতী শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা। ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভূজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভূজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা। পণ্ডিত কলহনের মতে, সরস্বতী দেবী হংসের রূপ ধারণ করে ভেড়গিরি শৃঙ্গে দেখা দিয়েছিলেন। এ ধরনের ধারণা সঙ্গত কারণ হংসবাহনা সরস্বতীর মূর্তি তো প্রচুর পাওয়া যায়। তিনি এ বাহন ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহন কিন্তু পাখি নয়। বেদে এবং উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যে সৃজনী শক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছেন হংস বা সূর্য একেবারেই যুক্তিসঙ্গত কারণে। তবে বৈদিক সাক্ষ্য থেকেই জানা যায় সিংহ ও ময়ূর ছিল সরস্বতী দেবীর আদি বাহন । কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ কেড়ে নিলেন আর কার্ত্তিক কেড়ে নিলেন ময়ূর। পরবর্তী সময়ে সরস্বতী দেবী রাজহংসকেই তাঁর চিরস্থায়ী বাহনের মর্যাদা দিলেন। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই হাঁসের সমান গতি, যেমন জ্ঞানময় পরমাত্মা সর্বব্যাপী - স্থলে, অনলে, অনিলে সর্বত্র তাঁর সমান প্রকাশ। হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুগ্ধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুগ্ধ বা ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে, জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও হংসের এ স্বভাব তাৎপর্য বহন করে। সংসারে নিত্য ও অনিত্য দুটি বস্তুই বিদ্যমান। বিবেক বিচার দ্বারা নিত্য বস্তুর বিদ্যমানতা স্বীকার করে তা গ্রহণ শ্রেয়, অসার বা অনিত্য বস্তু সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। হাঁস জলে বিচরণ করে কিন্তু তার দেহে জল লাগে না। মহাবিদ্যা প্রতিটি জীবের মধ্যে থেকেও জীবদেহের কোন কিছুতে তাঁর আসক্তি নেই, তিনি নির্লিপ্তা।
হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই তাঁর অপর নাম বীণাপাণি। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা। হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারে পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। অনেক বৌদ্ধ উপাসনালয়ে পাথরের ছোট ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, অবিকল সরস্বতীমূর্তি। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদন ছিল। জৈনদের চব্বিশজন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতমা হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর উভয় জৈন সম্প্রদায়েই সরস্বতীর স্থান হয়ে গেল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীতা একজন প্রধান দেবীরূপে। সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ - একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্‌ + বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। আবার সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। ঋগ্বেদে আছে 'অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী', সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শুধু বৈদিক যুগেই নয়, পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, সেখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল। যে প্রসবণ থেকে এই নদীর উৎপত্তি তা ছিল প্লক্ষ্ণাবৃক্ষের নিকটে, তাই একে বলা হতো প্লক্ষ্ণাবতরণ। ঋগ্বেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, সরস্বতী নদীই ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতানার মরুভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরুভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়ে ভবানীপুরে দৃশ্য হয়, আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়ে বরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়। তান্ডমহাব্রাহ্মণে সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে প্লক্ষ্ণপ্রস্রবণ ও বিনাশস্থল হিসেবে বিনশনের নামোল্লেখ আছে। লাট্যায়ণের শ্রৌতসূত্র মতে, সরস্বতী নামক নদী পশ্চিম মুখে প্রবাহিতা, তার প্রথম ও শেষভাগ সকলের প্রত্যক্ষ গোচর, মধ্যভাগ ভূমিতে নিমগ্ন যা কেউ দেখতে পায় না, তাকেই বিনশন বলা হয়। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের মতে, বৈদিক সরস্বতীর লুপ্তাবশেষ আজও কচ্ছ ও দ্বারকার কাছে সমুদ্রের খাড়িতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর বিনাশ ঘটেছিল অবশ্যই বৈদিক যুগের শেষভাগে, একমতে খ্রিস্টের দেড় হাজার বছরেরও আগে। মহাভারতে আছে যে নিষাদদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য বিনাশণ নামক স্থানে মরুভূমিতে অদৃশ্য হয়েছে। নদীর স্থানীয় নামই এই ঐতিহ্য বহন করছে। আবার অনেকে বলেন, সিন্ধুনদই সরস্বতী। সরস্বতী ও সিন্ধু দুটি শব্দের অর্থই নদী। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতীসদৃশা দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্ররা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পূজার দিন ইংরেজি বইয়ের পূজা নিষিদ্ধ ছিল। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু পণ্ডিতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা ! শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসে শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রী পঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত।সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার তাড়ি ও দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রী পঞ্চমী তিথিতে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। আধুনিকাকালে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রী পঞ্চমীর দিন সকালে সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করা হয়। পূজার শেষে সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমল লোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে’- এ মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন। বসন্ত পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজার পরের দিনটি বাংলায় শীতলষষ্ঠী হিসেবে পালিত হয়।এইদিনেও মায়েরা সন্তানের মঙ্গলকামনায় ব্রত রেখে থাকেন।

Thursday, 30 November 2017

দূর্বার মাহাত্ম্য

দূর্বার মাহাত্ম্য
দূর্বা আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বী দের পূজা বা যে কোন শুভ কাজের এক অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু কেন দূর্বা ব্যাবহার করা হয় তা অনেকেই জানি না। আজ আমরা তাই নিয়ে একটু আলোচনা করবো।
দুর্বার উল্লেখ আমরা ঋগ বেদ ও অথর্ব বেদে পাই। ভবিষ্য পুরাণে বর্ণিত আছে যে দুর্বার জন্ম হয় ভগবান বিষ্ণুর হাত ও উরুর লোম থেকে যখন তিনি সমুদ্র মন্থনে মন্দ্র পর্বতকে সাহায্য করছিলেন। আবার বামন পুরাণে উল্লেখ যে দুর্বার জন্ম হয় নাগ বাসুকীর পুচ্ছ থেকে যে সময় দেব-আসুরেরা মিলিত ভাবে সমুদ্র মন্থন করছিলেন। আবার আরেক পুরাণের কাহিনী অনুসারে দুর্বাসুর নামে এক কৃষ্ণ ভক্ত অসুর ছিলেন। দুর্বাসুরের মা কৃষ্ণ বিদ্বেষী ছিলেন। দুর্বাসুরের বাবা, ভাই দেবতার হাতে মারা যান। তাই মা দেবতার স্বর্গ রাজ‍্য ধ্বংস ও দেবতার মৃত্যু চাইতেন। মা দুর্বাসুরকে ত্রিদেবের তপস‍্যা করে (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব) অমর হয়ে ত্রিলোক জয় করতে আদেশ দিলেন। মা ত্রিলোকের রাজমাতা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করল।

মায়ের কথায় দুর্বাসুর নির্জনে কঠোর তপস‍্যা শুরু করে। হাজার বছর তপস‍্যার ফলে তার শরীরের মাংস পচে খসে পড়ে। উইপোকা ও পোকামাকড়ে খেয়ে হাড়ও খসে মাটিতে মিশে গেছে। তখনও ত্রিদেবের নামে ধ্যান হচ্ছে। দেবতারা ভয় পেয়ে দুর্বাসুরের তপস‍্যা ভঙ্গে ব‍্যর্থ হয়। অবশেষে ত্রিদেব দুর্বাসুরের কাছে এসে ব্রহ্মা কমন্ডুলের জল ছিটিয়ে পুর্বরূপ দিয়ে বর প্রার্থনা করতে বললেন।
দুর্বাসুর বললেন প্রভু আমি মাতৃ আজ্ঞাতে তপস‍্যা করেছি। মা অমরত্ব বর নিতে বলেছেন। হে গোবিন্দ আমাকে অমরত্ব বর দিলে মা আবারো খারাপ কাজ করাবে। তাই এমন বর দিন যাতে আমি অমরও হতে পারি আবার আপনার সেবায়ও লাগতে পারি। আর আমার দ্বারা যেন জগতের কারো অনিষ্ট না হয়।

ত্রিদেব সন্তুষ্ট হয়ে বললেন শুধু ত্রিদেব নয় জগতের সব দেবতার সেবায় লাগবে তুমি। দুর্বাসুর তুমি দুর্বা ঘাসে পরিণত হয়ে সব দেবতার পূজায় লাগবে। অক্ষয় তৃতীয়ায় অক্ষয় বরে জগতে সবাই মারা গেলেও দুর্বা ঘাস কখনো মরবে না। অমর থাকবে পৃথিবীতে।

পূজাতে দুর্বা পাতা লাগে তিনটি। তিনটি পাতায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব অবস্থান করেন। জগতে কোন শুভ কাজ ত্রিদেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই শুভ কাজে দুর্বা ছাড়া আশীর্বাদ হবে না। সেই থেকেই দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন হয়।
দূর্বা পবিত্রতার প্রতীক, দূর্বা পুনর্জীবন, দীর্ঘ জীবন, ও উন্নতির ও প্রতীক। তার কারণ হলো দূর্বার একটি ঘাস তুলে নিলেও তার জায়গায় আবার গজিয়ে উঠে নুতুন দূর্বা। দূর্বার সংস্পর্শে যা আসে তাই পবিত্র হয়ে উঠে বলে বিশ্বাস। দূর্বা সকল অশুভ শক্তিকে শোষণ করে শুভ শক্তির বিকিরণ করে তাই সকল পূজায় দূর্বার ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। 
দুর্বাকে পবিত্র মানার আরেকটি কারণ হলো বলা হয় দূর্বার গোঁড়ায় থাকেন স্বয়ং ব্রহ্মা, মধ্যে বিষ্ণু আর অগ্রভাগে মহেশ্বর।
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমীকে দূর্বা অষ্টমী হিসেবে পালন করা হয়। ঐ দিন দূর্বার অগ্রভাগ পূর্ব মুখী করে ভগবান কে দূর্বা উৎসর্গ করা হয় এই বিশ্বাসে যে এই অনুষ্ঠানের দ্বারা পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ পাওয়া যায়। 




আপনারা হয়তো দেখেছেন গনেশ কে দূর্বা দান করতে। কথিত আছে গনেশকে ২১গাছি দূর্বা দিয়ে প্রার্থনা করলে গণেশ ঠাকুর প্রসন্ন হন। রামেশ্বরমের মন্দিরে দেখেছি দুর্বা দিয়ে গণেশ কে আপাদমস্তক আবৃত করে দেওয়া হয়। এর পিছনে যা কাহিনী আছে তা সংক্ষেপে আপনাদের বলছি।
একসময় অনলাসুর নামে এক মহা প্রতাপবান ও অত্যাচারী অসুর ছিল, জানা যায় অনলাসুর যমরাজ ও অপ্সরা তিলত্তোমার ছেলে ছিল। সেই অনলাসুর একবার তপস্যার দ্বারা দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে বর লাভ করেছিল। বর হিসেবে তাঁর চোখ থেকে আগুনের গোলা বের করার ক্ষমতা লাভ করে এবং সেই থেকে তাঁর নাম হয় অনলাসুর। অনল মানে আগুন।এই মহাশক্তির বলীয়ান হয়ে অনলাসুর প্রবল অত্যাচারি হয়ে উঠে।নির্দয় ভাবে সে সকলকে হত্যা করতে শুরু করে। সাধু-সন্ন্যাসীদের যাগযজ্ঞ নষ্ট করে নির্বিচারে লুন্ঠন হত্যা করতে থাকে।এমনকি তাঁর হাত থেকে দেবতারাও নিস্তার পেলেন না।অনলাসুরের ভয়ে তাঁরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে থাকেন।অনলাসুর তাঁর চোখ থেকে আগুন গোলা দিয়ে চারিদিক ধংশ করতে থাকে, স্বর্গ মর্ত্ত পাতালে শুরু হয়ে যায় হাহাকার। 
অনলাসুর স্বর্গ থেকে দেবতাদের তাড়িয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে হত্যা করতে উদ্যত হলে ইন্দ্র সেখান থেকে পালিয়ে যান। ইন্দ্রের পলায়নের পর অনলাসুর স্বর্গ রাজ্যে অধিকার করে বসে।
.অনলাসুরের ভয়ে ভীত হয়ে অত্যাচারিত দেবতারা দেবগুরু বৃহস্পতির নির্দেশে ভগবান গনেশের শরনাপন্ন হয়ে গণেশ কে অনলাসুর থেকে স্বর্গ কে উদ্ধার ও দেবগন কে রক্ষা করার প্রার্থনা জানান। দেবতাদের কাতর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে ভগবান গণেশ তাঁদের কে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। গণেশ জানতেন যে অনলাসুর প্রচন্ড পরাক্রমী তাই তিনি অনলাসুর কে বধ করার জন্যে কৌশল অবলম্বন করলেন। গণেশ নিজেকে একটি ছোট্ট শিশুতে পরিনত করে অনলাসুরের সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন।অনলাসুরের চোখ থেকে নির্গত আগুনের গোলা গুলিদের তিনি কৌশলে এড়িয়ে যেতে থাকলেন কিন্তু সেই ভয়ানক আগুনের গোলা গুলি চারিদিক ধ্বংস করতে শুরু করলো। অনেকক্ষন যুদ্ধের পর অনলাসুর যখন শিশুরূপী গণেশ কে গ্রাস করতে উদ্যত হল। গণেশ তখন তাঁর বিরাট-রূপ ধারন করে অনলাসুর কে গিলে ফেলেন।
এদিকে অনলাসুর কে গিলে ফেলায় গণেশের শরীরের ভিতর সৃষ্টি হয় প্রচন্ড যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকেন, তাঁর এই অবস্থা দেখে স্বর্গের সকল দেবতারা মিলে গণেশের যন্ত্রণা দূর করার চেস্টা করতে থাকেন। দেবী পার্বতী গণেশের সর্বাঙ্গে চন্দনের প্রলেপ দিলেন,কিন্তু সেই আগুনের জ্বালার কোন প্রশমন হল না।দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর গলার সাপ দিয়ে গণেশের কোমর বেঁধে দিলেন,কিন্তু তাতেও কোন লাভ হলো না। আগুনের সেই ভীষণ যন্ত্রণায় গণেশ ছটফট করতে থাকেন।ভগবান বিষ্ণু তখন প্রচুর পরিমানে পদ্মের জল ছিটিয়ে দিলেন গণেশের গায়ে,সেই থেকে গণেশের এক নাম হয় পদ্মপাণি। তাতেও কোন লাভ হলো না।চন্দ্রদেব তাই দেখে গণেশের মাথার উপর অবস্থিত হয়ে শীতলতা প্রদান করতে শুরু করলেন সেই জন্য গণেশের আরেক নাম হয় ভালচন্দ্র। সকল প্রচেষ্টা বিফল হতে দেখে মহামুনি কাশ্যপ ২১টি দুর্বা গণেশের মাথায় নিবেদন করেন এবং সেই দুর্বা গুলিই গণেশের যন্ত্রণার অবসান ঘটালো, সেই দুর্বা গুলি দ্বারাই গণেশের শান্তি ফিরে এলো।এতে সন্তুষ্ট হয়ে গণেশ ঘোষণা করলেন যে দুর্বাই হবে উনার সবচাইতে প্রিয় আর যেই ভক্ত শ্রদ্ধা সহকারে ২১ টি দুর্বা গণেশকে নিবেদন করবে তাঁর জীবন ধনধান্যে পরিপূর্ণ হবে ও তাঁর জীবনে নেমে আসবে সুখ। পৃথিবীর সকল প্রকার জ্বালা যন্ত্রণা থেকে তাঁর জীবন হবে মুক্ত।আবার এই ২১ টি দুর্বার মাহাত্ম্য হিসেবে বর্ণিত আছে যে এই ২১টি দুর্বা কিন্তু প্রতীকী। এই ২১ টি দুর্বা হচ্ছে আমাদের মধ্যে পঞ্চ ভুত, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, ও মন এই সকলের প্রতীক।


আগের পর্বে আমরা জানতে পারলাম যে দূর্বা দ্বারা গণেশের মানসিক শান্তি লাভ হয়েছিল ও সাথে উনার পেটের জ্বালা ও উপশম হয়েছিল।একি নিছক গল্প না তার পিছনে লুকিয়ে আছে কিছু সত্যতা??এবার দেখব সেই ব্যাপারটা। 
আমাদের আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে দুর্বাকে নানাপ্রকার ঔষধে প্রয়োগ করা হয়, কারণ দুর্বার মধ্যে পাওয়া যায় নানাপ্রকার ঔষধিয় গুণ।
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে দুর্বা বাত দোষ দূর করতে ব্যাবহার করা হয়। দুর্বার বিশেষ বিশেষ ঔষধিয় গুণ সম্বন্ধে নীচে কিছু আলোচনা করা হলো।

দুর্বার রস মানসিক উত্তেজনা প্রশমিত করে।
চর্মরোগ সারাতেও দুর্বার প্রয়োগ করা হয়, আগের দিনে দুর্বা পিষে তার মধ্যে হলদি বাটা ও সর্ষ তেল দিয়ে গায়ে মাখার প্রচলন ছিল, তার ফলে চর্ম রোগ থেকে শরীর কে রক্ষা করার প্রতিষেধক লাভ হতো। আজও অনেকে তা করে থাকেন তবে তা বিশেষ বিশেষ দিনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। চর্ম রোগে আক্রান্ত জায়গায় দুর্বাকে এইভাবে প্রলেপ হিসেবে দিলে চর্ম রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।দুর্বার সঠিক ব্যবহারে কুষ্ট, এগজিমা,স্কেবিজ,চুলকানি সহ বিভিন্ন প্রকার চর্ম রোগ সারায়।
দুর্বার সাথে নিমপাতা মিশিয়ে নিয়মিত ভাবে সেবন করলে ডায়বেটিজ রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকে, রক্তে শর্করার মাত্রা কমতে সাহায্য করে। 
দুর্বার রস নিয়মিত ভাবে সেবন করলে শারীরিক ক্লান্তি দূর হয় ও অনিদ্রা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। নিয়মিত ভাবে দুর্বার রস পান করলে স্নায়ু গুলি (nerves) শক্তি লাভ করে। 
দুর্বার রস সকালে খালি পেটে পান করলে শরীরের বিষাক্ত পদার্থ সহজেই বাইরে বেরিয়ে আসে। রক্তকে বিশুদ্ধ করে আর শরীরের ক্ষার জাতীয় পদার্থের সমতা বজায় রাখে।
দুর্বার মধ্যে এমন গুণ আছে যা শরীরের কোলেস্টরেল কমায় ও মেদহ্রাস করতে সাহায্য করে। হৃদয়ের শক্তিকে আরও সবল করে তুলে।
দুর্বার কয়েক ফোটা চোখে দিলে চোখের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে।
দূর্বা রক্তে লোহিতকণা বৃদ্ধি করে হিমোগ্লোবিন মাত্রাকে বৃদ্ধি করে তোলে। 
নিয়মিত দুর্বার রস পান করলে পেটের অম্লতা দূর করে আর পেটের মধ্যের বিষাক্ত পদার্থকে দূর করে।
দুর্বার রসের সাথে দই মিশিয়ে খেলে মুত্রনালীর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দূর্বা ডিম্বাশয় কে সুদৃঢ় করে।
দূর্বার মধ্যে প্রচুর পরিমানে ফ্লেভনয়েদ থাকে যা আলসার সারাতে সাহায্য করে ও মাড়ির রক্তক্ষরণ কমায়, মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। দূর্বার রস ফুসফুস সংক্রমণও সারিয়ে তোলে।

Friday, 3 November 2017

পঞ্চতত্ত্ব

পঞ্চতত্ত্ব নিয়ে  কিছু...
আমাদের এই সম্পূর্ণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড 'ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম 'এই পাঁচটি বস্তুর উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাধারণভাবে অর্থ করা হয়ে থাকে যে, ক্ষিতি অর্থ মাটি, অপ অর্থ জল, তেজ অর্থ আগুন, মরুৎ অর্থ বায়ু এবং ব্যোম অর্থ শূণ্য লোক। ক্ষিতি অর্থ মাটি ঠিক আছে, তবে মাটি এখানে কেবল মাটি নয়, মাটি এখানে সাধারণভাবে সকল কঠিন পদার্থের (solids) সাধারণ প্রতীক, তেমনিভাবে অপ এখানে সকল তরল পদার্থ (liquids), মরুৎ এখানে সকল বায়বীয় পদার্থ (gases), তাহলে দেখা যায় যে, এ তিনটি ভূত সামগ্রীক ভাবে জগতের সকল বস্তু (matters) কে নির্দেশ করছে। অনুরূপভাবে তেজ অর্থ সকল শক্তি (energy)। পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী - বস্তু ও শক্তি পরষ্পর রূপান্তরযোগ্য। ব্যোম হল শূণ্য স্থান (space) আর আমাদের এই শরীরও ঐ পাঁচটি উপাদান দিয়েই তৈরী.এই পঞ্চভূত বা পঞ্চতত্ত্ব সহ পঁচিশ প্রকার গুণ আমাদের শরীরে বিদ্যমান তা কি কি আমরা একটু দেখে নেই। 

ব্রহ্মজ্ঞানে অস্থি, মাংস, নখ, ত্বক ও লোম এই পাঁচটি পৃথিবীর গুন বলে বর্নিত হয়েছে। শুক্র, শোণিত, মজ্জা, মল, মুত্র এই পাঁচটি জলের গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও আলস্য এই পাঁচটি অগ্নির গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। ধারণ, চালন, ক্ষেপণ, প্রসারণ ও সঙ্কোচণ এই পাঁচটি বায়ুর গুণ বলে বর্নিত হয়েছে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও লজ্জা এই পাঁচটি আকাশের গুণ বলে বর্ণিত হয়েছে। আকাশ হতে বায়ু, বায়ু হতে সূর্য(তেজ), সূর্য হতে জল এবং জল হতে পৃথিবীর উৎপত্তি হয়ে থাকে। এই পৃথিবী জলে বিলীন হয়, জল সূর্যে বিলীন হয়, সূর্য বায়ুতে এবং বায়ু আকাশে লীন হয়ে থাকে। এই পাঁচ প্রকার তত্ত্ব হতেই সৃষ্টি হয় এবং এই পঞ্চতত্ত্বেই সকল তত্ত্ব লয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এই পঞ্চবিধ তত্ত্বের পরে যে তত্ত্ব তাকেই বলে তত্ত্বাতীত বা নিরঞ্জন। স্পর্শন, রসন, ঘ্রাণ, দর্শন এবং শ্রবণ এই পাঁচটি কর্মই ইন্দ্রিয়ের পঞ্চতত্ত্ব আর এই সকল ইন্দ্রিয়ের কর্ম পরিচালিত করে মন(প্রধান)। এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল প্রকার লক্ষণ আমাদের এই দেহের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। 'সাকারাশ্চ বিনশ্যন্তি নিরাকারো ন নশ্যতে' অর্থাৎ যেগুলি সাকার সেই গুলির বিনাশ হয় এবং যেগুলি নিরাকার (আকার শুন্য) সেগুলি হয় অবিনাশী।

কৌশিকী অমাবস্যা

  ছবি  কৃতজ্ঞতাঃ- গুগল চিত্র পুরাণমতে, কৌশিকী অমাবস্যার শুভতিথিতে পরাক্রমশালী শুভ-নিশুম্ভ অসুর দুই ভাইকে বধ করার সময়েই দেবী পার্বতীর দেহের ...