Saturday, 17 July 2021

বদ্রীনাথ মন্দির

বদ্রীনাথ মন্দির

সঙ্কলকঃ-শ্রী দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী

বিখ্যাত বদ্রীনাথ মন্দিরটি উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের চামোলি জেলায় গাড়ওয়াল পার্বত্য অঞ্চলে অলকানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত।  প্রাচীন বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলিতে এই মন্দিরের প্রধান দেবতা বদ্রীনাথের উল্লেখ আছে, যা থেকে বোঝা যায়। যে বৈদিক যুগে এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল।গর্ভগৃহে  বদ্রীনারায়ণের  যে মূর্ত্তি টি আছে তা প্রায় ৩.৩ফুট উচ্চতার, কষ্টি পাথরের বিগ্রহ। একটি বদ্রী গাছের তলায় সোনার চাঁদোয়ার নীচে রাখা।বদ্রীনারায়ণের মূর্তির উপরের দুই হাতে শঙ্খ ও চক্র আর নীচের দুই হাত যোগ মুদ্রায় । শোনা যায় ৯ম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য প্রথম বদ্রীনাথকে একটি তীর্থস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ৮১৪ থেকে ৮২০ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তিনি এই অঞ্চলে ছিলেন। কথিত আছে বদ্রীনাথের মুর্তিটিকে অসুরের হাত থেকে রক্ষার জন্যে মন্দিরের পুরোহিতরা অলকানন্দার জলের তলায় লুকিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু পরে সেই জায়গাটী ভুলে যাওয়ায় মুর্তি উদ্ধার সম্ভব হয় নি, যোগাবলে শঙ্করাচার্য এই  বদ্রীনাথের মূর্তিটির সন্ধান পান এবং  তিনিই অলকানন্দা নদী থেকে উদ্ধার করে তপ্তকুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণের কাছে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। পুরাণ অনুসারে, এক ঋষি লক্ষ্মীকে বিষ্ণুর পাদসেবা করতে দেখেন, এবং  তাই দেখে তিনি বিষ্ণুকে তিরস্কার করেছিলেন। সেই জন্য বিষ্ণু বদ্রীনাথে এসে দীর্ঘ সময় পদ্মাসনে বসে তপস্যায় রত ছিলেন। তখন হিমালয়ের একটি অঞ্চলে মাংসভুক সন্ন্যাসী ও অসাধু লোকজনেরা বাস করত, কিন্তু এই স্থানটি তার থেকে দূরে ছিল বলে বিষ্ণু ধ্যানের জন্য এই স্থানটিকেই ঠিক করেন। ধ্যানের সময় বিষ্ণু এখানকার দারুণ শীত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তার স্ত্রী লক্ষ্মী একটি বদ্রী গাছের আকারে তাকে রক্ষা করেন। লক্ষ্মীর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু এই অঞ্চলের নাম দেন বদরিকাশ্রম। আবার  বিষ্ণুপুরাণে বদ্রীনাথের উৎপত্তি সম্পর্কে আরেকটি গল্প আছে। সেখানে আছে , ধর্মের দুই পুত্র ছিল – নর ও নারায়ণ, এঁরা হিমালয়ে পর্বতরূপ ধারণ করেছিলেন। তারা ধর্মপ্রচারে জন্য এই স্থানকে নির্বাচিত করেন এবং হিমালয়ের বিভিন্ন  বৃহৎ উপত্যকাগুলিকে বিবাহ করেছিলেন। আশ্রম স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গার অনুসন্ধানে এসে তারা পঞ্চবদ্রীর অন্যান্য চার বদ্রীর সন্ধান পান।  এগুলি হল বৃধাবদ্রী, যোগবদ্রী, ধ্যানবদ্রী ও ভবিষবদ্রী। অবশেষে তারা অলকানন্দা নদী পেরিয়ে উষ্ণ ও শীতল প্রস্রবনের সন্ধান পান এবং এই স্থানটির নামকরণ করেন বদ্রীবিশাল। ভাগবত পুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও মহাভারত-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থেও কিন্তু বদ্রীনাথ মন্দিরের উল্লেখ আছে, ভাগবত পুরাণ অনুসারে, বদরিকাশ্রমে ভগবান বিষ্ণু নর ও নারায়ণ ঋষি রূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন এবং সকল জীবের কল্যাণের জন্য তাঁরা এখানে স্মরণাতীত কাল থেকে এখানে  তপস্যা করেন। স্কন্দপুরাণ-র বলা হয়েছে, স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল লোকে অনেক পবিত্র তীর্থ আছে। কিন্তু বদ্রীনাথের মতো পবিত্র তীর্থ কোথাও নেই। পদ্মপুরাণ-এ বদ্রীনাথের আশেপাশের এলাকাটিকে আধ্যাত্মিক সম্পদে পরিপূর্ণ বলে উল্লেখ আছে।  মহাভারতে পাওয়া যায় যে  অন্যান্য তীর্থে মোক্ষ অর্জন করতে হলে ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়। কিন্তু বদ্রীনাথের কাছে এলেই ভক্তের মোক্ষ লাভ হয়ে যায়।



জানেন কি? বদ্রীনাথে শঙ্খ বাজানো নিষিদ্ধ!!!! কেন?

পুরাকালে হিমালয়ের পাদদেশে ঋষি-মুনিদের উপর অসুরদের অত্যাচার খুব বৃদ্ধি পায়। প্রায়ই অসুরেরা ঋষি মুনিদের আক্রমন করে তাঁদের আশ্রম লন্ডভন্ড করে বির্বিচারে হত্যা করতে লাগলো। শত শত ঋষি মুনিদের বন্দি করে দাস বানিয়ে রাখতো। তখন সকল ঋষি মুনিরা অগস্ত্য মুনির শরণাপন্ন হয়েছিলেন। অগস্ত্য মুনি তখন অসুরদের নিধনের জন্যে দেবী দুর্গা কে আহ্বান করেন। অগস্ত্যমুনির প্রার্থনায় দেবী কুষ্মান্ডা রূপে আবির্ভাব হয়ে অসুর নিধন শুরু করেন, একে একে সকল অসুর দেবীর হাতে পরাজিত ও নিহত হয় কিন্তু আতাপি ও বাতাপি নামক দুই অসুর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আতাপি অলকানন্দা নদীতে গিয়ে আত্মগোপন করে আর বাতাপি বদ্রীনাথ ধামে গিয়ে শঙ্খের ভিতরে লুকিয়ে পরে সেই থেকে বদ্রীনাথ ধামে শঙ্খ বাজানো নিষিদ্ধ হয় এবং সেই প্রথা আজও চলে আসছে। এই এক মাত্র মন্দির যেখানে শঙ্খ বাজানো যায় না।

সমাপ্ত

চিত্র সৌজন্যেঃ- গুগোল চিত্র


Wednesday, 14 July 2021

জয় মা বিপদতারিণী বা বিপদনাশিনী!!

 আসুন জেনে নেই কে এই দেবী?


যিনি সমগ্র বিপদ থেকে রক্ষা করেন বা যিনি বিপদ সমূহ নাশ করেন তিনিই বিপদতারিনী। যিনি দুর্গা তিনিই বিপদতারিনী, তিনিই আবার পুরাণে কৌশিকীদেবী নামে খ্যাতা, আবার তিনিই জয়দুর্গা। তিনি দেবী সঙ্কটনাশিনী এবং দেবী দুর্গার ১০৮ রূপের এক অন্যতম।, ভক্তেরা মূলত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য এই দেবীর পূজা করেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, বিপত্তারিণী ব্রত পালন করলে সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং সমস্ত বিপদ, বাধা বিঘ্ন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আমরা বিপদতারিণী বা বিপদনাশিনী দেবীর যে ধ্যান মন্ত্র পাঠ করি তা হল ‘ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্ । শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্ । সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবন – মখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্ । ধ্যায়েদ্ দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ ।
এখানে, কালাভ্র আভাং এর অর্থ কিন্তু দুই প্রকার হয়, একটি স্বর্ণ বর্ণা অপরটি কালো মেঘের ন্যায়), কটাক্ষে শত্রুকূলত্রাসিণী, কপালে চন্দ্রকলা শোভিতা, চারি হস্তে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল ধারিণী, ত্রিনয়না, সিংহোপরি সংস্থিতা, সমগ্র ত্রিভুবন স্বীয় তেজে পূর্ণকারিণী, দেবগণ-পরিবৃতা।সিদ্ধসঙ্ঘ সেবিতা জয় দুর্গার ধ্যান করি।
এই জয়দুর্গা বা কৌশিকীদেবী ( এই কৌশিকীদেবীর উৎপত্তি হয়েছিলো পরমেশ্বর ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী দেবী পার্বতীর কৃষ্ণ কোশ থেকে- তাই তিনি কৌশিকী), বিপদতারিণীদুর্গা যিনি পঞ্চদেবতার একজন। ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থানে এই দেবীর অনেক রূপ দেখা যায়, উত্তর ভারতে অষ্টাদশ রূপের ধ্যান ও পূজা হয়, আবার কোথাও তাঁকে দশভুজা রূপে পূজা হয়, কোথাও আবার চতুর্ভুজা স্বর্ণ বর্ণা আবার কোথাও কৃষ্ণ বর্ণা রূপে পূজিতা হয় । আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষ দ্বিতীয়ার পরের মঙ্গল ও শনিবারে মায়ের পূজো হয় । যেখানে তেরো প্রকার ফল, পুস্প, মিষ্টি, পান সুপারী দিয়ে মাকে পূজা করা হয়। তবে, বাংলাদেশে দেবীর পূজার নিয়ম বিধি সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে গ্রামাঞ্চলে বিপত্তারিণী পূজা চলে চারদিন ধরে। প্রথম দিনে দেবীর “আরাধনা” (পূজা) করা হয়। মেয়েরা দণ্ডী কাটেন, তারপর দুই রাত্রি ধরে রাতে বাংলা লোকগান, ভজন ও কীর্তন চলে। চতুর্থ দিনে হয় বিসর্জন। বিপত্তারিণী পূজা উপলক্ষে মেয়েরা উপবাস করেন। প্রথা অনুসারে হাতে “তাগা” (এক গুচ্ছ পবিত্র লাল সুতো ও দূর্বাঘাস) বাধা হয়। কিন্তু কেন এই দেবীকে তেরো প্রকারের দ্রব্য দিয়ে পূজা করা হয়? তার কারণ কোন ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ নেই, এ হয়তো বা লোকাচার।
কিছু কিছু অঞ্চলে আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে, সন্তান কামনার জন্য পালন করা হয় ষষ্ঠীব্রত সেই ষষ্ঠীর নাম ‘কোঁড়া ষষ্ঠী’ বা ‘কার্দমী ষষ্ঠী’ বা ‘কর্দ্দমষষ্ঠী’। এই ষষ্ঠীব্রতের দিনে মায়েরা দেবী ষষ্ঠীকে তেরোটি ফুল, তেরোটি ফল, তেরোটি পান, তেরোটি সুপারি, তেরোটি দুর্বা দিয়ে পূজা করেন। সম্ভবতঃ সেখান থেকে এই তেরো ফল-ফুল-পান –সুপারী ইত্যাদি এই পূজায় অন্তর্গত হয়েছে যেহেতু এই দুই পূজার সময়কাল প্রায় এক। আবার অনেকে মনে করেন এই ষষ্ঠীদেবী আর মা বিপদ-তারিণী একই দেবী। তবে সে যাই হোক ভক্তের ভক্তিভাব স্ফুরণের জন্যে, শ্রদ্ধার জন্যে দেবীকে যে ভাবেই পূজা করা হোক না কেন, তিনি আমাদের আরাধ্যা হউন। ভক্তের ত্রাস দূর করে জগতকে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বিপদন্মুক্ত করুন এই প্রার্থনা রাখি।
নীচের চিত্রগুলি দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রকাশ, ভক্ত মানসে তিনি যেভাবে স্থান নিয়েছেন। উপরের ছবি আমাদের ঘরের দেবী কিন্তু নীচের ছবি গুলি গুগোল চিত্র থেকে সংগৃহীত
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সোনারপুর অঞ্চলের রাজপুরে বাবা দুলাল নামে এক ভক্তসাধক মায়ের বিপত্তারিণী রূপের সাধনা করেন ও তিনি মাকে সিংহবাহিনী চতুর্ভুজা কালী রূপে দর্শন করেন। সেই বাবা দুলালের সাধনা এখন সর্বজনবিদিত। রাজপুরের এই মা বিপত্তারিণী চন্ডীর মহিমা এখন প্রায় সকলেই জানেন।
এর মধ্যে আপনারা দেবীর কোনরূপে আরাধনা করেন?? বা আর অন্য কোন রূপ আছে কি? জানতে দেবেন।
সঙ্কলক
শ্রীদেবাশীষ চক্রবর্ত্তী
সাধারনতঃ পঞ্জিকায় আমরা যে ছবি পাই

রাজপুরের বিপদতারিণী চন্ডী বাড়িতে মা



Saturday, 19 June 2021

দশহরা বা গঙ্গা পূজা

 দশহরা বা গঙ্গা পূজা






গামীকাল জ্যৈষ্ঠ  মাসের শুক্লা দশমী,  দশহরা বা গঙ্গা পূজা।এই দিনই রাজা ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মা গঙ্গা পৃথিবীতে নেমে আসেন। সেই দিনের তিথি ছিল জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা দশমী। স্কন্ধপুরাণে আছে এই দিনে গঙ্গায় স্নান করে, গঙ্গাকে দশটি ফুল, দশটি ফল ও দশটি প্রদীপ দিয়ে পুজো করলে আমাদের জ্ঞানে বা অজ্ঞানে করা দশটি পাপ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। দশ পাপ হরণ হয় বলেই এই তিথি কৃত্যের নাম দশহরা, এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিথি।
আসুন দেখে নেই এই দশপ্রকার পাপ কি? কি? যা থেকে এই দিনে মুক্তিলাভ সম্ভব
পরদ্রব্য হরণ, অযথা হিংসা অর্থাৎ বৃথা প্রাণী হত্যা ও পরদার গমন অর্থাৎ অবৈধ প্রণয় এই তিনটি হলো আমাদের দেহগত পাপ। অহংকারী বাক্য, মিথ্যা কথা বলা, পরনিন্দা এবং অসংবদ্ধ প্রলাপ বা বাজে বকা— এই চারটি হলো আমাদের বাক্যগত পাপ।মনে মনে পরের দ্রব্যের কামনা, পরের অনিষ্ট চিন্তা এবং মিথ্যার প্রতি আসক্তি— এই তিনটি হলো আমাদের মানসিক পাপ।
গঙ্গা নদীর বর্ণনা আমরা বৈদিক যুগ থেকেই পাই, পুরাণ মতে গঙ্গা স্বর্গের দেবী।তপস্যার দ্বারা এই দেবীকে মর্তে এনেছিলেন সগর রাজার বংশজ রাজা ভগীরথ, যিনি আবার ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ। পৌরাণিক আখ্যানে আছে সগর রাজার ছিলো ষাট হাজার পুত্র, কিন্তু সকলেই তাঁদের পাপকর্মের ফলে মহাসাধক কপিল মুনির অভিশাপে পড়েন এবং যোগবলে কপিলমুনি তাঁদের সকলকে ভস্ম করে দেন। কপিল মুনির অভিশাপে ভস্ম হলে,তাদের মুক্তিলাভের জন্য স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে আনতে দেবী গঙ্গার তপস্যা করতে করতে একে একে রাজা সগর, অসমঞ্জ, অংশুমান, দিলীপ রাজা দেহ ত্যাগ করেন,অবশেষে দিলীপ পুত্র ভগীরথ সফল হয়ে গঙ্গাকে মর্তে আনতে পারেন। সেইদিন ছিলো জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা দশমী।
বৈদিক যুগের কোনও এক সময়ে দশহরা তিথি থেকেই বৎসর গণনা শুরু হতো তাই দশহরা সেদিন নববর্ষের পূর্ণ মর্যাদায় ছিলো। দশহরার প্রধান কাজ হলো গঙ্গায় স্নান করা, কিন্তু যারা দূরে আছেন বা বিভিন্ন কারনে অক্ষম তাঁরা কি করবেন??? নিজের স্নানের জলে দু-তিন ফোঁটা গঙ্গা জল মিশিয়ে এই মন্ত্র
‘নমঃ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতী
নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু

পাঠ করুন, বিশ্বাস এই মন্ত্রের সাহায্যে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, ও কাবেরীকে স্মরণ করে স্নানের জলে এই নদীগুলির পবিত্রতা ও শুদ্ধতা এনে নিজের জীবন কে শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ করা যায়। পরে হাতজোড় করে
‘নমঃ কুরুক্ষেত্র গয়া গঙ্গা প্রভাস পুষ্করিণী চ
তীর্থান্যেতানি পুণ্যানি স্নানকালে ভবন্ত্বিহ’

এই বলে স্নান করে নিন, গঙ্গা স্নান হয়ে যাবে। অবশ্য এতে আস্থা থাকা চাই, কথায় আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।
ভালো থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
শ্রী দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী
৪ই আষাঢ়,১৪২৮বঙ্গাব্দ
১৯শে জুন,২০২১ইং
ছবিঃ-সৌজন্যেঃ গুগোল

Tuesday, 8 June 2021

সাবিত্রী চতুর্দ্দশী ব্রত


ছবিঃগুগল চিত্র

প্রসঙ্গঃ সাবিত্রী চতুর্দ্দশী ব্রত
আজ থেকে শুরু হয়েছে সাবিত্রী চতুর্দ্দশী ব্রত, এই তিনদিন দেবী সাবিত্রী, সাবিত্রী সত্যবান ও ধর্মরাজের পূজা হয়ে থাকে। সাবিত্রী চতুর্দ্দশী ব্রতকথা অনুযায়ী -- মদ্র দেশের রাজা ছিলেন অশ্বপতি এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন মালবী। তাঁদের কোন সন্তানাদি ছিলো না, তাই সন্তানের প্রত্যাশায় তাঁরা দেবীসাবিত্রীর আরাধনা করতে লাগলেন। সাবিত্রীদেবী খুশি হয়ে বর দিলেন এক কন্যা সন্তানের। সূর্যের অধিষ্ঠাত্রী সাবিত্রীদেবীর বরে জন্ম বলে কন্যার নাম রাখলেন সাবিত্রী। দেখতে দেখতে সাবিত্রী বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠলেন। অশ্বপতি কন্যাকে নিজেই নিজের উপযুক্ত পাত্রের অন্বেষণ করতে বললেন। সাবিত্রী বিভিন্ন স্থান ঘুরে এসে পিতাকে জানালেন যে শাল্ব দেশের রাজা দ্যুমৎসেনের পুত্র সত্যবানকে তিনি মনে মনে স্বামী হিসেবে বরণ করেছেন। এবারে রাজা অশ্বপতি দেবর্ষি নারদের শরণাপন্ন হলেন সত্যবানের পরিচয় জানতে, এতে দেবর্ষি বলেন সত্যবান হলেন শাল্বদেশের রাজা দ্যুমৎসেন ও তাঁর স্ত্রী শৈব্যার একমাত্র পুত্র সন্তান ও শাল্বদেশের যুবরাজ, কিন্তু ঘটনাক্রমে দ্যুমৎসেন অন্ধ হয়ে গেলে তাঁর শত্রুরা তাঁকে রাজ্যচ্যুত করেন। এরফলে রাজা সপরিবারে বনবাসী হন এবং বনে এসে দ্যুমৎসেন সস্ত্রীক তপস্যা করতে থাকেন। সত্যবানও তাঁর মাতাপিতার সেবা করে তাপসের জীবনযাপন করতে শুরু করেন। বাল্যকালে সত্যবান ঘোড়া ভালোবাসতেন এবং মাটি দিয়ে অশ্বমূর্তি নির্মাণ করতেন। সে জন্য সত্যবানের অপর নাম চিত্রাশ্ব।রাজা অশ্বপতির এই ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। তখন রাজা তাঁর পরামর্শ জানতে চাইলেন। তখন নারদ জানালেন আরো ভয়ানক কথা, সত্যবান সুদর্শন, সত্যবাদী, দাতা ও ব্রাহ্মণসেবী সত্যি কিন্তু তার আয়ু আর এক বছর। এক বছর পরই তার মৃত্যু ঘটবে। অশ্বপতি সে কথা শুনে কন্যাকে অন্য কোন পাত্রকে বরণ করতে বললেন। কিন্তু সাবিত্রী এতে রাজি হলেন না। সবিত্রী বললেন, ‘মনে মনে যাকে একবার স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। তিনিই আমার স্বামী। আমি আর অন্য কাউকে নিজের স্বামী হিসেবে বরণ করতে পারবো না।’ কন্যার যুক্তি মেনে নিলেন অশ্বপতি। সত্যবানের সঙ্গেই সাবিত্রীর বিয়ে হল। সাবিত্রী হিসাব রাখছিলেন, কখন এক বছর পূর্ণ হয়। অবশেষে যখন একবছর পূর্ণ হতে আর মাত্র চার দিন বাকী তখন তিনি উপবাস শুরু করলেন। যে দিন সত্যবানের মৃত্যুর দিন সেদিন সাবিত্রী সত্যবানের সাথে সাথে থাকলেন প্রতি মুহূর্ত। সে দিন সত্যবান বন থেকে কাঠ ও ফলমূল সংগ্রহ করতে বনের গভীরে যাচ্ছেন দেখে সাবিত্রীও তাঁর সঙ্গ নিলেন। যদিও সাবিত্রী উপবাসে দুর্বল দেখে সত্যবান নিতে চাইছিলেন না, কিন্তু সাবিত্রী তা মানলেন না। সত্যবানের সাথেই গেলেন। এক মুহূর্তের জন্যও তাকে চোখের আড়াল হতে দিলেন না। কাঠ কাটতে কাটতেই সত্যবান অসুস্থ বোধ করলো। বললো প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। সাবিত্রী সত্যবানকে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়তে বললেন। সত্যবান তাই করলো। শুয়ে চোখ বন্ধ করলো। তখন এক ভয়ঙ্কর পুরুষ এসে একহাতে সত্যবানের প্রাণ আর হাতে প্রাণহীন দেহ নিয়ে চলতে শুরু করলে সাবিত্রীও কোন কথা না বলে তাঁর পিছু পিছু চলতে শুরু করলেন। যম সাবিত্রীকে বললেন যে, স্বামীর প্রতি ওঁর যা কর্তব্য তা সম্পন্ন হয়েছে, এখন বাড়ি ফিরে যেতে, কিন্তু সাবিত্রী থামলেন না। যমকে বললেন, স্বামীছাড়া কোন নারীর পক্ষে নির্জন বনে ধর্ম মেনে চলা সম্ভব না। তারপর তিনি যমকে ধর্মকথা শোনাতে লাগলেন। যম তাতে তুষ্ট হয়ে সত্যবানের জীবন ছাড়া আর যে কোনও বর চাইতে বললেন। সাবিত্রী তখন যমের কাছে তাঁর শ্বশুরের অন্ধত্ব দূর করে দিতে বললেন। যম সেই বর দিয়ে ক্লান্ত সাবিত্রীকে ফিরে যেতে বললেন। কিন্তু কোনকথা না শুনে সাবিত্রী চলতেই থাকলেন। বললেন যে, প্রাণপতির কাছাকাছি থাকলে কোন স্ত্রী কখনো ক্লান্ত হয় না। এছাড়া যম সজ্জন, সুতরাং উনি সাধুসঙ্গ করছেন। যম তখন তুষ্ট হয়ে পতির জীবন ছাড়া আরেকটি বর দিতে চাইলেন। সাবিত্রী এবার বর চাইলেন যেন ওঁর শ্বশুর পুনর্বার তাঁর রাজ্য লাভ করেন। যম সেই বর দিলেন তারপর সাবিত্রীকে বললেন আর পরিশ্রম না করে ফিরে যেতে। সাবিত্রী না ফিরে যমকে সনাতন ধর্মের কথা শোনালেন। যম তাতে প্রীত হয়ে সাবিত্রীকে পতির জীবন ছাড়া অন্য কোনও বর চাইতে বললেন। সাবিত্রী বললেন যে, ওঁর পিতা রাজা অশ্বপতি আজও পুত্রহীন - তাঁর যেন শতপুত্র হয়। যম বর দিয়ে বললেন, অনেক দূরে চলে এসেছো, এবার ফিরে যাও সাবিত্রী। সাবিত্রী বললেন, এটা আমার কাছে দূর নয়, আমি আমার স্বামীর সাথে সাথেই রয়েছি। তারপর যমের প্রশংসা করে বললেন যে, যম সমবুদ্ধিতে প্রজাশাসন করেন বলে তিনি ধর্মরাজও। যম হলেন সজ্জন। নিজের চেয়েও সজ্জনদের উনি বেশি বিশ্বাস করেন। সুতরাং নিজের ক্ষতি নিয়ে তাঁর কোন দুশ্চিন্তা নেই। যম খুশি হয়ে বললেন, সত্যবানের জীবন ছাড়া তিনি আরেকটি বর দিতে চান। সাবিত্রী এবার চাইলেন, ‘আমার গর্ভে যেন সত্যবানের ঔরসে বলশালী শতপুত্র হয়’। যম সাবিত্রীর প্রার্থিত বর দিয়ে বললেন, ধর্মকন্যা, এবার ফিরে যাও। কিন্তু সাবিত্রী আবারো যেতে থাকলেন আর ধর্মকথা শুনাতে থাকলেন। সাবিত্রীর ধর্মসম্মত কথা শুনে যম খুব সন্তুষ্ট হয়ে আর একটা বর দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন সাবিত্রী বলেন যে যমরাজ স্বয়ং ধর্মপ্রাণ ও নিতীপরায়ন তিনিই বর দিয়েছিলেন যে সাবিত্রী সত্যবানের ঔরসে পুত্রলাভের সৌভাগ্য লাভ করবেন এবং সেই সত্য রাখতে যমরাজকে সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দিতেই হবে। এবারে নিজের বাক্যের সত্য রক্ষা করতে গিয়ে যম সাবিত্রীকে পঞ্চম বর দিতে বাধ্য হন এবং অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ সত্যবানের আত্মা সাবিত্রীকে ফিরিয়ে দিয়ে
সাবিত্রীকে আশীর্বাদ করে বিদায় নেন। এরপর সাবিত্রী সত্যবানের অচেতন শরীরের কাছে এসে, তাঁর মাথা কোলে তুলে নিয়ে বসেন এবং অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ সত্যবানের আত্মা সত্যবানের দেহে স্থাপন করেন। পরে সত্যবানের সংজ্ঞা ফিরে এলে, উভয়েই আশ্রমে ফিরে যান।এইভাবে ধর্ম দিয়ে, সততা দিয়ে সাবিত্রী তাঁর স্বামীর জীবন রক্ষা করলেন। পরদিন আশ্রমে ফিরে ব্রতের পারনা করেন ও সকল আশ্রম বাসীর কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন, তখন সকল আশ্রম বাসীরা সাবিত্রীর জয়গান করতে থাকেন এদিকে যমের আশীর্বাদে দ্যুমৎসেনের চক্ষু ও রাজ্যলাভ এবং অশ্বপতির শতপুত্র ও লাভ হয়। সাবিত্রীর স্বামীর প্রতি এই প্রগাঢ় ভালোবাসা তাঁকে আজও অমর করে রেখেছে সতী নারী হিসেবে।
সঙ্কলকঃ শ্রী দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী

Friday, 23 April 2021

গোপালের ডান বুকে একটি পায়ের ছাপ আছে......কার সেটি?

 আপনাদের যাদের ঘরে গোপালের মুর্ত্তি আছে তাঁরা হয়তো লক্ষ্য করেছেন গোপালের ডান বুকে একটি পায়ের ছাপ আছে। জানেন কি এই পায়ের ছাপটি কার? হয়তো বা আপনারা অনেকেই জানেন। যারা জানেন না তাঁদের জন্যে তুলে ধরছি এর কারন।

এক কাহিনী  অনুসারে

একবার সকল দেবতারা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মধ্যেকে শ্রেষ্ঠ কে, তা জানার জন্য মহর্ষি ভৃগুর শরণাপন্ন হন। মহর্ষি ভৃগু তখন এই তিন দেবতাদের পরীক্ষার জন্য সর্ব প্রথম ব্রহ্মার কাছে যান এবংতিনি ইচ্ছা করে ব্রহ্মার প্রতি সম্মান না দেখালে, ব্রহ্মা তাঁর প্রতি তীব্র ক্রোধ প্রকাশ করেন। পরে স্তব দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট করে মহাদেবের কাছে যান। মহাদেবকে সম্মান না দেখানোর কারণে, মহাদেব তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হন, এবারও ভৃগু স্তব করে মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন। এরপর ইনি বিষ্ণুকে পরীক্ষা করার বিষ্ণুর আবাসস্থল গোলকধামে যান। সেখানে বিষ্ণুকে নিদ্রিত অবস্থায় দেখে ইনি বিষ্ণুর বক্ষে পদাঘাত করেন।বিষ্ণু ঘুম থেকে জেগে উঠে ভৃগুর পায়ে আঘাত লেগেছে মনে করে  পদসেবা করতে থাকেন।   বিষ্ণু মহর্ষি ভৃগুর পা ধরলেন এবং এমনভাবে হাত বুলাতে লাগলেন, যাতে ঋষির আরাম বোধ হয়। বেদে আছে, ঋষি ভৃগুর পায়ের পাতায় একটি অতিরিক্ত চোখ ছিল। এই কাজ করার সময় বিষ্ণু ঋষির অতিরিক্ত চোখটিতে চাপ দিলেন। কথিত আছে, ঋষির এই অতিরিক্ত চোখটি ছিল তার অহংকারের প্রতীক। ঋষি তখন  তাঁর  ভুল বুঝতে পেরে বিষ্ণুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। সেই থেকে তাঁর বোধ হল ত্রিমূর্তির মধ্যে বিষ্ণুই শ্রেষ্ঠতম।এরপর ভৃগু বিষ্ণুকেই শ্রেষ্ঠ দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি দেন। উল্লেখ্য এরপর থেকে বিষ্ণুর বুকে ভৃগুর পদচিহ্নের ছাপ পড়ে যায়।

ভগবান শ্রী বিষ্ণু বা গোপালের বিগ্রহ যখনই তৈরি করা হয় তখনি ভগবানের ডান বক্ষের দিকে ভৃগু মুনির চরণ অঙ্কন করা হয়। ভৃগু মুনির চরণের ছাপ ছাড়া গোপাল ঠাকুরের বিগ্রহ সম্পূর্ণ হয় না।

(চলবে)

Saturday, 17 April 2021

প্রসঙ্গঃ- গীতা

প্রসঙ্গঃ- গীতা 

 আমরা জানি শ্রীমদ্ভাগবত গীতাতে সর্বমোট ৭০০ টি শ্লোক ও ১৮টি অধ্যায় আছে আর সেই আঠারোটি অধ্যায় নিয়ে শ্রীমদ্ভাগবত গীতাতে ব্যাসদেব সর্বমোট আঠারোটি যোগের উল্লেখ করেছেন। সেই আঠারোটি যোগ হল

১ অর্জুন বিষাদ-যোগ
২ সাংখ্য যোগ
৩ কর্ম যোগ
৪ জ্ঞান যোগ
৫ সন্ন্যাস যোগ
৬ ধ্যান যোগ
৭ জ্ঞান বিজ্ঞান যোগ
৮ অক্ষর ব্রহ্মযোগ
৯ রাজ যোগ
১০ বিভুতি যোগ
১১ বিশ্বরূপ দর্শন যোগ
১২ ভক্তি যোগ
১৩ ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ
১৪ গুনত্রয়বিভাগযোগ
১৫ পুরুষোত্তমযোগ
১৬ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ
১৭ শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ
১৮ মোক্ষযোগ
যোগশাস্ত্রের প্রণেতা মহর্ষি পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গ যোগের সব উপদেশ গীতা থেকেই সংগৃহীত
গীতা-কে গীতোপনিষদ বলা হইয়ে থাকে কারন গীতা উপনিষদ্‌ এর অন্তর্গত। যদিও "উপনিষদ্‌" ধর্মগ্রন্থগুলি শ্রুতিশাস্ত্রের অন্তর্গত কিন্তু গীতা মহাভারত-এর অংশ বলে গীতা কিন্তু স্মৃতিশাস্ত্রের অন্তর্গত। আবার উপনিষদের শিক্ষার সারবস্তু গীতা-য় সংকলিত হয়েছে বলে একে বলা হয় "উপনিষদ্‌সমূহের উপনিষদ্‌"।গীতা-কে অনেক ক্ষেত্রে মোক্ষশাস্ত্র নামেও অভিহিত করা হয়।

গীতা-র বিষয়বস্তু হল ভগবান শ্রী কৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু ঠিক আগে অর্জুন যখন শত্রুপক্ষে নিজের আত্মীয়, বন্ধু ও গুরুকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় কৃষ্ণ তাকে ক্ষত্রিয় যোদ্ধার ধর্ম স্মরণ করিয়ে এবং বিভিন্ন প্রকার যোগশাস্ত্র ও বৈদান্তিক দর্শন ব্যাখ্যা করে তাকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেন। তাই গীতা-কে হিন্দুদের জীবনচর্যার একটি ব্যবহারিক পথনির্দেশিকা হিসেবে গণ্য করা হয়। গীতাতে শ্রী কৃষ্ণ যোগশাস্ত্র ব্যাখ্যার সম্রিষন নিজের "স্বয়ং ভগবান" রূপটি উন্মোচিত করেন এবং বিশ্বরূপে অর্জুনকে দর্শন দেন। অর্জুন ছাড়াও প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণের মুখ থেকে গীতা শুনেছিলেন সঞ্জয়, হনুমান কারন তখন হনুমান অর্জুনের রথের চূড়ায় ছিলেন আর ঘটোৎকচের পুত্র বর্বরিক যিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সব ঘটনা দেখেছিলেন।

মূল গীতার আঠারটি অধ্যায় আবার ঐ আঠারটি অধ্যায়ের প্রকৃতি বিচার করলে দেখা যায় যে ওই অধ্যায় গুলি কোন না কোন যোগের অন্তর্গত বলে মনে হয়। প্রথম, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায় কে ভক্তি যোগ , দ্বিতীয়, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম অধ্যায় কে জ্ঞানযোগ, তৃতীয় কর্ম যোগ ও চতুর্থ অধ্যায়কে ধ্যানযোগের অন্তর্গত করা যায়।

জ্ঞানযোগ কি? ঈশ্বর কি এবং কেমন তা বিচার করে জানার উপায়, ভক্তিযোগ হল ঈশ্বরকে ভালোবেসে তাঁকে পাওয়ার উপায়, ধ্যানযোগ বা রাজযোগ হল মনকে একাগ্র করে তাঁর স্বরূপ কে প্রত্যক্ষ করার চেষ্ঠা আর সকল কর্মের ফল ঈশ্বরে সমর্পন করে নিষ্কাম চিত্তে কর্তব্য সম্পন্ন করে তাঁকে লাভ করাকে কর্মযোগ বলে। সব যোগের একই উদ্দেশ্য জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন। এই মধুর মিলনকেই জ্ঞানীরা বলেন ব্রহ্মানুভুতি, যোগীরা বলেন আত্মজ্ঞান লাভ বা সমাধি,ভক্তদের কাছে এ ঈশ্বরলাভ, কর্মযোগীদের কাছে এ কর্মবন্ধন থেকে মুক্তিলাভ। অনেকেই সাধারন ভাবে এই মিলনকে সিদ্ধিলাভ বলে মনে করেন।


Saturday, 22 August 2020

প্রসঙ্গঃ গণেশ ও গণেশ চতুর্থী

গণেশের প্রার্থনা মন্ত্র

দেবেন্দ্রমৌলিমন্দারমকরন্দকণারুণাঃ

বিঘ্নং হরন্তু হেরম্বচরণাম্বুজরেণবঃ।।

 

ভাদ্র মাঘমাসের শুক্লাচতুর্থীকে গণেশ চতুর্থী বলা হয় হিন্দু বিশ্বাসে এই দিনটি গণেশের জন্মদিন গণেশ চতুর্থী সংক্রান্ত একটি কিংবদন্তী হিন্দুসমাজে প্রচলিত, একবার গণেশ চতুর্থীতে প্রতি বাড়িতে মোদক ভক্ষণ করে ভরা পেটে ইঁদুরে চেপে ফিরছিলেন গণেশ পথে ইঁদুরের সামনে একটি সাপ এসে পড়লে সে ভয়ে কাঁপতে শুরু করে এতে গণেশ পড়ে যান তাঁর পেট ফেটে সব মোদক রাস্তায় পড়ে যায় গণেশ উঠে সেগুলি কুড়িয়ে পেটের মধ্যে পুরে পেটের ফাটা জায়গাটি ওই সাপ দিয়ে বেঁধে দেন আকাশ থেকে চন্দ্র তা দেখে হেসে ফেলেন তাই গণেশ শাপ দেন যে চতুর্থীর দিন চাঁদ কেউ দেখবে না প্রসঙ্গত উল্লেখ্য গণেশ অত্যন্ত মোদকপ্রিয় দেবতা অন্যমতে, এই দিনে শিব গণেশকে লুকিয়ে কার্তিকেয়কে একটি ফল দিয়েছিলেন চন্দ্র তা দেখে হেসে ফেলেন বলে শিব চন্দ্রকে অভিশাপ দেন হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এই দিন গণেশ তাঁর ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন

গণেশ পুরাণ- উল্লিখিত গণেশের চার অবতার সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর কলিযুগে অবতীর্ণ হন এঁরা হলেন

মহোৎকট বিনায়ক ইনি দশভূজ রক্তবর্ণ বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় এঁর বাহন হয় হাতি নয় সিংহ ইনি সত্য যুগে কশ্যপ অদিতির সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেই কারণে কাশ্যপেয় নামে পরিচিত হন [৫৮] এই অবতারে তিনি নরান্তক দেবান্তক নামে দুই অসুরভ্রাতা ধূম্রাক্ষ নামে এক দৈত্যকে বধ করেন

ময়ূরেশ্বর ইনি ষড়ভূজ শ্বেতবর্ণ বাহন ময়ূর ত্রেতা যুগে শিব পার্বতীর পুত্ররূপে এঁর জন্ম এই অবতারে তিনি সিন্ধু নামে এক দৈত্যকে বধ করেনঅবতারকাল সমাপ্ত হলে ময়ূরটি তিনি তাঁর ভ্রাতা কার্তিকেয়কে দান করেন

গজানন ইনি চতুর্ভুজ রক্তবর্ণ বাহন ইঁদুর ইনি দ্বাপর যুগে শিব পার্বতীর পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন সিন্দুর নামে এক দৈত্যকে তিনি এই অবতারে বধ করেন এই অবতারেই রাজা বরেণ্যর নিকট তিনি গণেশ গীতা প্রকাশ করেন

ধূম্রকেতু দ্বিভূজ অথবা চতুর্ভূজ ধূম্রবর্ণ বাহন নীল ঘোড়া ইনি কলি যুগের শেষে অবতীর্ণ হবেন অনেক দৈত্য বধ করবেন এই অবতার বিষ্ণুর শেষ অবতার কল্কির অনুসরণে কল্পিত

মুদ্গল পুরাণ মুদ্গল পুরাণ- গণেশের আটজন অবতারের বর্ণনা পাওয়া যায় এঁরা হলেন

বক্রতুণ্ড প্রথম অবতার এঁকে ব্রহ্মের অংশ পরম বলে মনে করা হয় ইনি সিংহবাহন এই অবতারের উদ্দেশ্য মাৎসর্যাসুর (অর্থাৎ ঈর্ষা) বধ

একদন্ত ইনি প্রত্যেক ব্যক্তিগত আত্মা পরমব্রহ্মের প্রতীক ইনি মুষিকবাহন এই অবতারের উদ্দেশ্য মদাসুর (অর্থাৎ, অহং) বধ

মহোদর ইনি বক্রতুণ্ড একদন্তের সম্মিলিত রূপ ব্রহ্মের প্রজ্ঞার প্রতীক মোহাসুর (অর্থাৎ সংশয়) বধ এই অবতারের উদ্দেশ্য ইনিও মুষিকবাহন

গজবক্ত্র বা গজানন মহোদরের অন্যরূপ লোভাসুর (অর্থাৎ লোভ) বধ এই অবতারের উদ্দেশ্য

লম্বোদর ব্রহ্মের শক্তির প্রতীক ইনি মুষিকবাহন ক্রোধাসুর (অর্থাৎ রাগ) বধ এই অবতারের উদ্দেশ্য

বিকট সূর্যের প্রতীক জ্যোতির্ময় ব্রহ্মের প্রকাশ কামাসুর (অর্থাৎ কামনাবাসনা) বধ এই অবতারের উদ্দেশ্য ইনি ময়ূরবাহন

বিঘ্নরাজ বিষ্ণুর প্রতীক ব্রহ্মের অস্তিত্বের প্রকাশ মমাসুর (অর্থাৎ অহংকার) বধের উদ্দেশ্যে এই অবতার

ধূম্রবর্ণ শিবের প্রতীক ব্রহ্মের বিনাশ শক্তির প্রকাশ ইনি অশ্ববাহন অভিমানাসুর (অর্থাৎ গরিমা) বধের উদ্দেশ্যে এই অবতার

 

গণেশ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে থাকেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস আর সেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে গণেশ অভিষেকের নিয়ম গুলি কিছুটা এই রকম

 

আপনি যদি চাকরি পাওয়ার জন্য পূজা করেন, তা হলে আগের দিন রাত্রে একটি পাত্রে গঙ্গাজল দিয়ে তার মধ্যে একটু সুপারি ভিজিয়ে রাখুন পর দিন ওই সুপারিটি তুলে নিয়ে ওই জল দিয়ে মন্ত্র বলতে বলতে অভিষেক অর্থাৎ স্নান করান

যদি প্রচুর শত্রুতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে হাতির দাঁতের তৈরি কোনও জিনিস গঙ্গাজলে ডুবিয়ে রেখে সেই জল দিয়ে অভিষেক করান বা গঙ্গাজলের মধ্যে লাল চন্দন গুঁড়ো ফেলে তার মধ্যে দেবদারু পাতা ভিজিয়ে সেই জল দিয়ে অভিষেক করালেই শত্রু দমন হয়

ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে বা চাকরিতে পদোন্নতি আটকে গেলে আপনি পান পাতার রস কাপড়ে ছেঁকে তার সঙ্গে একটি এলাচ, একটি লবঙ্গ এবং একটু মৌরি বেটে তার রসটুকু কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে অর্ধেক সুপারি এক সঙ্গে গঙ্গাজলে মিশিয়ে সেই জল দিয়ে অভিষেক করাবেন

অনেকের বহু দিনের ইচ্ছা একটা নিজস্ব বাড়ি কিন্তু কিছুতেই তা পূরণ হচ্ছে না সিদ্ধিদাতার কাছে মনপ্রাণ দিয়ে কামনা করুন দেখবেন ঠিক উনি পূরণ করবেন আপনার সাধ পূজার আগে গঙ্গাজলে একটু বেসন মিশিয়ে নিয়ে সেই জল দিয়ে ওঁর অভিষেক করাবেন

কোথাও কোনও টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে, কিন্তু পাচ্ছেন না সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সিদ্ধিদাতার কাছে প্রার্থনা জানাবেন এবং অভিষেকের সময় গঙ্গাজলের পাত্রে একটু আখের রস মিশিয়ে নেবেন

স্বামীর সুস্থতার জন্য সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজা করুন যাতে তিনি দীর্ঘজীবী হন, আপনার সিঁদুর যাতে চির অক্ষয় থাকে সে ক্ষেত্রে গঙ্গাজলে অল্প সিঁদুর(মেটে লাল) ঘি মিশিয়ে নেবেন তারপর সেই জলে অভিষেক করাবেন

অভিষেকের মন্ত্র হলো ‘‘বক্রতুণ্ডায় হুম 

                       -----------------------------

গণেশের বাহন ইদুর


পুরাকালে মুষিকাসুর নামে এক প্রচন্ড অত্যাচারী অসুর ছিল, তাঁর দুর্বিসহ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হলে মাহাদেব দেবতাদের আস্বস্থ করে শিব গনেশকে মুষিকাসুর নিধন করতে অসুরপুরী আক্রমণ করতে বলেন, পিতার নির্দেশে অসুরপুরী আক্রমণ করে অসুর নিধন করতে লাগলেন,সবশেষে মুষিকাসুর যুদ্ধে এলে গণেশ তাকে মুষিকে পরিনত তাঁর পিঠে চরে বসেন। গণপতি গণেশের বিশাল দেহের চাপে যখন মুষিকাসুরের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠলো।মুষিকাসুর তখন গণেশের কাছে নিজের প্রাণভিক্ষা চাইলে গণেশ তাকে ক্ষমা করেন এবং মুষিকাসুরকে চিরকাল তাঁর বাহন হিসেবে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন এবং এও বলেন যে তাঁর বাহন ক্ষুদ্র মুষিক হলেও তিনি সবসময় সামান্য ফুলের সমান উজন নিয়েই মুষিকের পিঠে উঠবেন।আবার আরেকমতে কোন একসময় ইন্দ্রের সভায় যখন গন্ধর্বরা ইন্দ্রের সাথে গভীর আলোচনায় ব্যাস্ত তখন এক গন্ধর্ব সেই আলোচনায় অন্যমনস্ক হয়ে অপ্সরাদের সাথে আমোদ প্রমোদের মেতে উঠলে ক্রোধিত ইন্দ্র তাকে ইদুরে পরিনত করে মর্ত্যে নিক্ষেপ করতে প্রহরীদের আদেশ করেন, তাকে মর্ত্যে নিক্ষেপ করলে সেই মুষিক্রূপী গন্ধর্ব গিয়ে পড়েন পরাশর মুনির আশ্রমে এবং সেই মুনির আশ্রমে প্রচণ্ড তাণ্ডব শুরু করে, সেই অবস্থায় সেই আশ্রমের মুনিরা বিঘ্নহর্তা গনেশের শরণাপন্ন হন। গণেশ তখন সেই মুষিকরূপী গন্ধর্ব কে শান্ত করে নিজের বাহন করে নেন।

                                                                                                     *****************

আজ শুভ গণেশ চতুর্থী, সেই উপলক্ষ্য মাথায় রেখে আজ হয়ে যাক গণেশ ময় দিন।

ভাদ্র ও মাঘমাসের শুক্লাচতুর্থীকে গণেশ চতুর্থী বলা হয়। হিন্দু বিশ্বাসে এই দিনটি গণেশের জন্মদিন। হিন্দু চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভাদ্রমাসে যা সাধারণত আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই পড়ে, গণেশ পুজোর আয়োজন করা হয়। গণপতি, বিনয়াক এবং বিঘ্নহন্তার মতো নানা নাম গণেশের। বলা হয়, গণেশ পুজো বাদ দিয়ে কোনও পুজোই সম্পূর্ণ হয় না।গণেশকে বলা হয় বিঘ্নহন্তা অর্থাৎ যিনি বাধা বিপত্তি নাশ করেন। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নানা বিপত্তি থেকে মুক্তি পেতেই ভক্তরা এই পুজো করেন।গণেশ যে খেতে ভালোবাসেন তা সকলেরই জানা। বিশেষ করে লাড্ডু আর মোদক তাঁর প্রিয়। মোদক হল চালের গুঁড়ো দিয়ে নারকেলের পুর দিয়ে তৈরি বিশেষ মিষ্টি।গণেশের মাথাটি হাতির মতো কেন, তার ব্যাখ্যা একাধিক পুরাণের নানা গল্পে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত, এই ব্যাখ্যা গণেশের জন্ম-সংক্রান্ত একটি বিষয়। এই সব গল্পে গণেশ-উপাসনাকারী সম্প্রদায়ের বিপুল জনপ্রিয়তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। ভক্তেরা সাধারণত তাঁর গজমুণ্ডটিকে বুদ্ধি, অতুলনীয় শক্তি, বিশ্বস্ততা এবং হাতির অন্যান্য চারিত্রিক গুণের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাঁর বিশাল কানদুটি জ্ঞান ও সাহায্যপ্রার্থীর প্রার্থনা শ্রবণের ক্ষমতার প্রতীক।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এর কাহিনি অনুসারে, গণেশের জন্ম হয়েছিল অন্যভাবে। শিব ও পার্বতী পুত্রলাভের আশায় বর্ষব্যাপী পুণ্যক ব্রত ও বিষ্ণুপূজা করেছিলেন। এই ব্রতে তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু বলেছিলেন, তিনি প্রতি কল্পে পার্বতীর পুত্ররূপে অবতীর্ণ হবেন। এরপর পার্বতীর গর্ভে এক পুত্রের জন্ম হয়। সকল দেবদেবী তাঁর জন্ম উপলক্ষে উৎসবে মেতে ওঠেন। যদিও সূর্যের পুত্র শনি শিশুটির দিকে তাকাতে ইতস্তত করেন। কারণ শনির দৃষ্টি অমঙ্গলজনক। কিন্তু পার্বতীর পীড়াপীড়িতে শনি শিশুটির দিকে তাকাতে বাধ্য হন। মুহুর্তের মধ্যে শিশুর মস্তক ছিন্ন হয়ে গোলোকে চলে যায়। শিব ও পার্বতী এতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লে বিষ্ণু গরুড়ের পিঠে চড়ে পুষ্পভদ্র নদীর তীরে এসে উপস্থিত হন। সেখান থেকে তিনি একটি হস্তিশিশুর মাথা নিয়ে ফিরে আসেন। এরপর পার্বতীর শিশুর মুণ্ডহীন দেহে সেই হাতির মাথাটি বসিয়ে তার প্রাণ ফিরিয়ে আনা হয়। এই শিশুর নাম রাখা হয় গণেশ এবং দেবতারা তাঁকে আশীর্বাদ গণপতি, বিনয়াক এবং বিঘ্নহন্তার মতো নানা নাম গণেশের।

সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি সম্ভবত শিব পুরাণ থেকে গৃহীত হয়েছে। এক দিন দেবী পার্বতী কৈলাসে স্নান করছিলেন। স্নানাগারের বাইরে তিনি নন্দীকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, যাতে তাঁর স্নানের সময় কেউ ভিতরে ঢুকতে না পারে। এই সময় শিব এসে ভিতরে প্রবেশ করতে চান। নন্দী শিবের বাহন। তাই প্রভুকে তিনি বাধা দিতে পারলেন না। পার্বতী রেগে গেলেন। তিনি ভাবলেন, নন্দী যেমন শিবের অনুগত, তেমনই তাঁর অনুগত কোনো গণনেই। তাই তিনি তাঁর প্রসাধনের হলুদমাখা কিছুটা নিয়ে গণেশকে সৃষ্টি করলেন এবং গণেশকে নিজের অনুগত পুত্র রূপে ঘোষণা করলেন।এরপর থেকে পার্বতী স্নানাগারের বাইরে গণেশকে দাঁড় করাতেন। একবার শিব এলেন। তিনি ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলেন। কিন্তু গণেশ তাঁকে বাধা দিলেন। শিব রেগে গিয়ে তাঁর বাহিনীকে আদেশ দিলেন গণেশকে হত্যা করার। কিন্তু তারা গণেশের সামান্য ক্ষতি করতেও সক্ষম হল না।এতে শিব অবাক হলেন। তিনি বুঝলেন, গণেশ সামান্য ছেলে নয়। তাই তিনি নিজে গণেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এলেন। শিব গণেশের মুণ্ডটি কেটে তাকে হত্যা করলেন। একথা জানতে পেরে পার্বতীও রেগে সমগ্র সৃষ্টি ধ্বংস করে ফেলতে উদ্যোগী হলেন। তখন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তাঁর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন। পার্বতী দুটি শর্ত দিলেন। প্রথমত, গণেশের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং সকল দেবতার পূজার আগে তাঁর পূজার বিধি প্রবর্তন করতে হবে।এই সময় শিবেরও রাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি পার্বতীর শর্ত মেনে নিলেন। তিনি ব্রহ্মাকে উত্তর দিকে পাঠিয়ে বললেন, যে প্রাণীটিকে প্রথমে দেখতে পাওয়া যাবে, তারই মাথাটি কেটে আনবে। কিছুক্ষণ পরে ব্রহ্মা এক শক্তিশালী হাতির মাথা নিয়ে ফিরে এলেন। শিব সেই মাথাটি গণেশের দেহে স্থাপন করলেন। তারপর তাঁর মধ্যে প্রাণের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হল। শিব গণেশকে নিজ পুত্র ঘোষণা করলেন এবং সকল দেবতার পূজার আগে তাঁর পূজার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই সঙ্গে তাঁকে সকল গণের অধিপতি নিযুক্ত করা হল।

গণেশের উৎপত্তি ও তাঁর হাতির মাথা নিয়ে আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে: পুরাকালে হাতির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক অসুরের অস্তিত্ব ছিল। তার নাম ছিল গজাসুর। সে একবার প্রচণ্ড তপস্যা করেছিল। শিব তার তপস্যার তুষ্ট হয়ে তাকে মনোমত বর দিতে ইচ্ছা করেন। অসুর চাইল, তার শরীর থেকে যেন সব সময় আগুন বেরিয়ে আসতে থাকে, যাতে কেউ তার কাছে ঘেঁষতে সাহস না পায়। শিব তাকে সেই বর দেন। কিন্তু গজাসুর তার তপস্যা চালিয়ে গেল। শিব আরেকবার তার সামনে এসে তাকে বর দিতে চাইলেন। অসুর বলল, “আমি চাই আপনি আমার পাকস্থলীতে বাস করুন।অল্পে তুষ্ট শিব গজাসুরকে মনোমত বর দিয়ে দেন। কিন্তু এই বর অন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। পার্বতী তাঁকে খুঁজতে বের হন। শেষে তিনি নিজের ভাই বিষ্ণুর সাহায্যে শিবকে খুঁজে পান। বিষ্ণু তখন শিবের বাহন নন্দীকে এক নৃত্যকারী ষাঁড় বানিয়ে নিজে বাঁশিওয়ালার ছদ্মবেশ নেন। এরপর উভয় আসেন গজাসুরের কাছে বাঁশি বাজাতে। বিষ্ণুর বাঁশি শুনে গজাসুর খুশি হয়ে তাঁকে কিছু দিতে চাইল। বিষ্ণু বললেন, তাঁর গজাসুরের পাকস্থলীতে বন্দী শিবের মুক্তি চাই। সে বিষ্ণুকে চিনতে পেরে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ল শিব মুক্তি পেলেন। তখন গজাসুর শেষ বরটি চাইল। সে বলল, “আমি চাই, আমি মরে যাবার পরও যেন লোকে আমার মাথাটিকে পূজা করে।শিব তখন নিজের পুত্রকে সেখানে এনে গজাসুরের সঙ্গে নিজ পুত্রের মুণ্ডবদল করালেন। সেই থেকে সকল দেবতার পূজার আগে গণেশের পূজা চালু হল।

     _________________________________

নষ্ট চন্দ্র

 

একবার গণেশ চতুর্থীতে প্রতি ভক্তের বাড়িতে মোদক ভক্ষণ করে ভরা পেটে ইঁদুরে চেপে ফিরছিলেন গণেশ এখানে উল্লেখ্য গণেশ অত্যন্ত মোদকপ্রিয় দেবতা।পথে ইঁদুরের সামনে একটি সাপ এসে পড়লে সে ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। এতে গণেশ পড়ে যান ও তাঁর পেট ফেটে সব মোদক রাস্তায় গড়িয়ে পরে যায়। গণেশ উঠে সেগুলি কুড়িয়ে পেটের মধ্যে পুরে পেটের ফাটা জায়গাটি ওই সাপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। আকাশ থেকে চন্দ্র ঙ্গণেশের এই কান্ড কারখানা দেখে হেসে ফেলেন, এবং গনেশের বিশাল দেহ ও গজমুখ নিয়ে অপমান করতে শুরু করেন।চন্দ্রের এমন আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে গণেশ শাপ দেন যে ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীর দিন যে চাঁদ দেখবে তাঁর জীবনে নেমে আসবে দুর্ভোগ হতে হবে অপমানিত। কথিত আছে এ থেকে স্বয়ং কৃষ্ণও নিস্তার পান নি, সেই দিনে চাঁদকে দেখে কৃষ্ণ মণি অপহরণের মিথ্যা অভিযোগে অপমানিত হয়ে ছিলেন।

 

অপর এক কাহিনী অনুসারে ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশ কৈলাশ থেকে জন্মদিনের ভোজ সেরে যখ স্ত্রী রিদ্ধি ও সিদ্ধি কে নিয়ে গণলোকে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন পথে চন্দ্রের সাথে দেখা হয়, আপন সৌন্দর্যে গর্বিত চন্দ্র গণেশের হাথির মাথা ও বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক আচরণ করেন এবং রিদ্ধি ও সিদ্ধির মট অপ্রুপ সুন্দরী স্ত্রী গণেশের ভাগ্যে কি করে জুটলো এ নিয়ে অপমান করতে থাকেন এতে গণেশ ক্রুদ্ধ হয়ে চন্দ্রকে অভিসপমাত করেন ফলে চন্দ্র নিশপ্রভ হয়ে পড়েন, গণেশ এও অভিশাপ দেন যে ের পর থেকে আর কেউ চন্দ্রকে দেখবে না আর যদি দেখে তবে তাঁর জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসবে। চন্দ্র তখন গনেশের কাছে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন এতে গণেশ শান্ত হয়ে তাঁর অভিশাপ কে কিছুটা লাঘব করেন,চন্দ্রে জ্যোতি ফিরে আসলেও মুখে কালো ছাপের কিছু কলঙ্ক থেকে যায় ও ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থীতে চন্দ্র শাপগ্রস্থই থাকেন যার ফলে ঐদিন চন্দ্রদেব নষ্ট চন্দ্র হিসেবে থেকে যান,তার দর্শনের ফলে মানব জীবনে দুঃখ নেমে আসে।







কৌশিকী অমাবস্যা

  ছবি  কৃতজ্ঞতাঃ- গুগল চিত্র পুরাণমতে, কৌশিকী অমাবস্যার শুভতিথিতে পরাক্রমশালী শুভ-নিশুম্ভ অসুর দুই ভাইকে বধ করার সময়েই দেবী পার্বতীর দেহের ...