Saturday, 14 January 2023

মকর সংক্রান্তির ইতিকথা ও ইতিহাস

 




মকর সংক্রান্তির ইতিকথা ও ইতিহাস

পৌষ বা মকর সংক্রান্তিতে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকরে সঞ্চারিত হয়, তাই এর নাম 'মকর সংক্রান্তি'। একে 'উত্তরায়ণ সংক্রান্তি'-ও বলে, কারণ এই দিন থেকে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে। পৌরণিক মতে উত্তরায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেবতাদের দিন শুরু হয়। আর দক্ষিণায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেবতাদের রাত্রি শুরু হয়। আর সেই দীর্ঘ রাত্রি কাটিয়ে দেবতারা দিনে প্রবেশ করার সময়টিকে হিন্দু শাস্ত্র মতে ধুমধাম সহকারে পালন করা হয়।এই সংক্রান্তির ব্রহ্মমুহূর্তে যমুনা নদীতে মকর-স্নান করলে আয়ুবৃদ্ধি হবে -- এই বিশ্বাসে মাতা যশোমতী বালক কৃষ্ণকে স্নান করাতে নিয়ে যান। পরে এদিনেই যমুনায় স্নান সেরে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতি রাধিকার সঙ্গে 'মকর-পাতায়', এ হল আত্মার সঙ্গে আত্মার দৃঢ় বন্ধন স্থাপন।
বাংলার অনেক স্থানে একসময় কুমারী মেয়েরা এইদিন থেকে কনকনে ঠান্ডার ভোরে একমাস ব্যাপী মকরস্নান-ব্রত শুরু করতো। আলস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা, জড়তা-তামসিকতার রিপুগুলিকে জয় করার এ ছিল এক সংগ্রামী মনোবৃত্তি। ছড়া গেয়ে পাঁচ ডুব দেওয়ার নিয়ম ছিল: "এক ডুবিতে আই-ঢাই।/দুই ডুবিতে তারা পাই।।/তিন ডুবিতে মকরের স্নান।/চার ডুবিতে সূর্যের স্নান।/পাঁচ ডুবিতে গঙ্গাস্নান।।"
২. উত্তরায়ণ সংক্রান্তিতে বাস্তুপূজার প্রচলন আছে। শঙ্খপাল, বঙ্কপাল, ক্ষেত্রপাল, নাগপালের ধ্যান করে বাস্তুর ধ্যান ও মানসোপচারে পূজা করা হয় এইদিন। বাস্তুর প্রণাম মন্ত্র হল, "ওঁ বাস্তুরাজ নমস্তুভ্যং পরমস্থানদায়ক। সর্বভূতজিতস্ত্বঞ্চ বাস্তুরাজ নমোহস্তু তে।" এরপর পাদ্যাদি দিয়ে গ্রাম্যদেবতার পূজা করা হয় এবং পায়স-বলি দান করা হয়।
'আমার মা'র বাপের বাড়ি' গ্রন্থে রানী চন্দ লিখছেন, পৌষ সংক্রান্তি "মহাধুমধামের সংক্রান্তি। বসতভিটার মঙ্গলের জন্য বাস্তুপূজা হয় এ দিন। তুলসীমন্ডপে 'ঝিকা' গাছের ডাল কেটে তার তলায় পুজো হয়। পুরুতমশাই নিজে 'চরু' রান্না করে দিয়ে যান। আজ এই চরু-ই পূজার প্রধান অঙ্গ।" চরু রান্না হয় পাটশলমির আগুনে, নতুন মাটির হাঁড়িতে দুধ-চাল-বাতাসা ফুটিয়ে।
৩. পৌষ সংক্রান্তি দিনে গ্রাম-বাংলার অনেক স্থানে উঠোনে মড়াই-এর পাশে 'উঠোন লক্ষ্মী'র পুজো হয়। তিনিই কোথাও 'পৌষলক্ষ্মী'। এদিন বাড়ির উঠোন গোবরজল দিয়ে নিকিয়ে, শুচি-স্নিগ্ধ করে তোলা হয়। ধানকাটা পর্বে যে 'পৌষ তোলা'র চার-পাঁচ গুচ্ছ ধানগাছ সাদরে গৃহস্থ বাড়িতে আনা হয়েছিল, তাই গাদা থেকে নামিয়ে মাথায় বহন করে নামানো হয় উঠোনে। গোটা উঠোন জুড়েই আলপনার নান্দনিকতা। আঁকা হয় লক্ষ্মীর নানান গয়না; চাষের সমস্ত উপকরণ--গরু, লাঙল, জোয়াল, মই; আর লক্ষ্মীর পা--পৌষ গাদা থেকে পুজোস্থল পর্যন্ত, পুজোস্থল থেকে গৃহের সিংহাসন পর্যন্ত। এই চরণ চিহ্নে পা ফেলেই যেন লক্ষ্মী ঘরে আসবেন। বাংলার কোনো কোনো স্থানে একে বার (বাহির) লক্ষ্মীপুজোও বলে। পুজো শেষ হলেই ঠাকুর তোলা যায় না। রাতে লক্ষ্মীপেঁচা বা শেয়ালের (দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলে শেয়াল লক্ষ্মীর বাহন বলে কথিত) ডাক শুনে উঠোন থেকে লক্ষ্মীকে ঘরে তোলা হয়। গভীর রাতে লক্ষ্মী তুলে উঠোন নিকিয়ে ঘুমতো যান গৃহকর্ত্রী।
৪. পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি লোকাচার হল 'আওনি-বাউনি' বা 'আউরি-বাউরি'। এটি আগের দিন পালিত হয়। তবে দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলে এর নাম 'চাঁউনি-বাউনি' বা 'চাউড়ি-বাউরি' যা পৌষপার্বণের দু'দিন আগে 'মচ্ছিমূলো' খেয়ে পালিত হয়। 'গণদেবতা' উপন্যাসে এর বর্ণনা এইরকম, "....আউরি-বাউরি দিয়া সব বাঁধিতে হইবে, মুঠ লক্ষ্মীর ধানের খড়ের দড়িতে সমস্ত সামগ্রীতে বন্ধন দিতে হইবে, -- আজিকার ধন থাক, কালিকার ধন আসুক, পুরানে নূতনে সঞ্চয় বাড়ুক। লক্ষ্মীর প্রসাদে পুরাতন অন্নে নূতন বস্ত্রে জীবন কাটিয়া যাক নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায়। অচলা হইয়া থাক্ মা, অচলা হইয়া থাক্।" সোনার পৌষ যে চলে যায়, তাকে বাঁধতে হবে! তাই শিসসহ ধানগাছ পুজো করে ঘরের খুঁটি, গোলা, গোয়াল ঘর, সিন্দুক ঢেঁকিশালে তা বাঁধা হয়। আর শস্য-সম্পদের শ্রীবৃদ্ধি কামনা করা হয়। তারই অঙ্গ হিসাবে বাংলার মেয়েরা ছড়া কেটে পৌষ বন্দনা করেন, "পৌষ পৌষ -- সোনার পৌষ/এস পৌষ যেয়ো না/জন্ম জন্ম ছেড়োনা।/না যেয়ো ছাড়িয়ে পৌষ--/না যেয়ো ছাড়িয়ে,/পৌষ পৌষ -- সোনার পৌষ।"
৫. পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে রাঢ় তথা পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় 'টুসু জাগরণ' হয়। টুসু উত্সবের শুরু অঘ্রাণ সংক্রান্তিতে। পৌষ সংক্রান্তির ভোরে সূর্যোদয়ের আগে টুসু বিসর্জন দেওয়া হয়। কারণ সূর্যের সঙ্গে টুসুর ভাসুর-বুয়াসি বা ভাদ্র-বউ সম্পর্ক। যেহেতু চৌডল ব্যবহার করলে সূর্যদেব দর্শিত হন না, তাই সুদৃশ্য চৌডলে টুসু ভাসান যায়।
তুষ-তুষলীর ব্রতিনীরা এই দিন মাস-কালীন ব্রতের শেষে জমিয়ে রাখা তুষ-গোবরের গুলি মাটির হাঁড়িতে রেখে আগুন ধরায়। তারপর তা ভাসিয়ে দেয় নদী বা পুকুরের জলে। একাধিক ব্রতিনীর ভাসানো অগ্নিশিখা বহনকারী হাঁড়ি বায়ুচালিত হয়ে ঘাট-ঘাটলার কিনারে কিনারে চরে বেড়ায়।
৬. বাংলার কোনো কোনো স্থানে এদিন 'ধর্মের পিঠে' উত্যাপিত হয়। এই লোকানুষ্ঠানটি ধর্ম বা সূর্য পূজার অঙ্গ। বাড়ির উঠোন সকালে গোবর জলে নিকিয়ে নতুন কলকে নিয়ে পিটুলির ৫টি গোলাকার ছাপ দেওয়া হয়। ছাপ পড়ে গোয়ালে, গবাদিপশুর দেহে, গোলায়, ঢেঁকিশালে এবং ঘরের মধ্যে। গৃহস্থের সামগ্রিক কল্যাণ কামনাই এই লোকানুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।
৭. দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় এদিন বত্সরান্তের কৃষিকাজ সমাপনান্তে খামার খুঁটিকে কেন্দ্র করে উত্সবের আয়োজন হয়। একে 'মেহি পূজা' বলে, কারণ 'মেহি'-র অর্থ খুঁটি। এই খুঁটি ঝাড়াই-মাড়াই সহ নানান কাজের সাক্ষী, গরু বাঁধার স্থান। তাই মেহি পূজা বা খামার পূজা হল এক কৃতজ্ঞতার অনুষ্ঠান, ধন্যবাদাত্মক চিন্তন। খুঁটিকে কেন্দ্র করে আঁকা হয় নানান কৃষি উপকরণের আলপনা, পরিষ্কার করে সাজানো হয় সেইসব উপকরণ। কৃষক-পুরুষ শেয়ালের ডাক শুনে পুজোয় বসেন। পুজো শেষে নতুন ধানে ভরা মান মরাইতে তুলে সে বত্সরের মত কৃষিকার্যের সমাপ্তি হয়।
৮. পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রহণ করা হয় দধি সংক্রান্তির ব্রত। এ দিন সেই ব্রতের সূচনা, প্রতি সংক্রান্তিতে তার আচরণ এবং পরের বছর এই দিনেই ব্রতের প্রতিষ্ঠা বা সমাপ্তি। এই দিন দধি দ্বারা বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে স্নান করিয়ে দধি ও ভোজ্য ব্রাহ্মণকে দান করা হয়। শোনা হয় ব্রতকথা।
ফল-সংক্রান্তি ব্রতের অঙ্গ হিসাবে এই সংক্রান্তিতে হরিতকী দান করলে হংসযুক্ত রথে আরোহণ করে বৈকুন্ঠে গমন করা যায় বলে হিন্দুদের বিশ্বাস।
৯. পৌষপার্বণ পিঠেপুলির অনুষ্ঠান। এজন্য চাল কোটা হয় 'বাউড়ি'-র আগের দিন। চাল গুঁড়ো, ভেজা চাল সর্বদা উঠোন-ঘর করতে হলে তা পাত্রে ঢেকে, তুলসি পাতা আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে নিয়ে যেতে হয়, নইলে তা ভূতে পায়।
ঠাকুরমা'র ঝুলির 'কাঁকণমালা, কাঞ্চনমালা' গল্পে রয়েছে 'পিট-কুড়ুলির ব্রত'-র কথা, রাজ্যে পিঠা বিলানোর অনুষ্ঠান। রাণীকে চালের গুড়োয় আঙ্গিনায় আলপনা দিয়ে পিড়ি সাজিয়ে দিতে হয়, দাসীরা পিঠের যোগার-যাগাড় করে। রাণী রূপী দাসী তৈরি করেন আস্কে পিঠা, চাস্কে পিঠা আর ঘাস্কে পিঠা; দাসী বানান চন্দ্রপুলি, মোহনবাঁশী, ক্ষীরমুরলী, চন্দনপাতা। দাসী চালের গুঁড়োয় খানিকটা জল মিশিয়ে এতটুকু নেকড়া ভিজিয়ে পদ্ম আঁকলেন, পদ্ম-লতার পাশে সোণার সাত কলস আঁকলেন; কলসের উপর চূড়া, দুই দিকে ধানের ছড়া, ময়ূর, পুতুল, মা লক্ষ্মীর সোনা পায়ের দাগ।
সংক্রান্তির পূর্বদিন অনেক স্থানে ভাজা পিঠে হয়; তা সেদিন ও পরদিন সকালে খাওয়া হয়। সংক্রান্তির দিন তৈরি হয় নানান পিঠে, সেগুলি সেদিন ও পরদিন খাওয়া হয়। পৌষ পার্বণের পরদিনও পিঠে তৈরি হয় যা তার পর দিন পর্যন্ত খাওয়া হয়। এইভাবে গ্রাম বাংলায় পরপর চারদিন পিঠে উত্সব ও ভোজন।
পৌষ সংক্রান্তিকে 'তিল সংক্রান্তি'-ও বলে। এদিন তিল দিয়ে নাড়ু, মিষ্টি তৈরি করে পূজায় নিবেদিত হয়। লোকবিশ্বাস, এই দিন তিল না খেলে নাকি দিন বাড়ে না অর্থাত্ সূর্যের মকর যাত্রা সংঘটিত হয় না।
১০. মেদিনীপুরে এইদিন লৌকিকদেবী বড়াম; মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হুগলীতে সিনিদেবী এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণায় বারা ঠাকুরের যুগ্মমূর্তি, নারায়ণী ও দক্ষিণ রায়ের বাত্সরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
মেদিনীপুর, পিংলা, ময়না, সবং অঞ্চলের মাহিষ্য কৃষক সম্প্রদায় এদিন বিকেলে 'বণিপুজো'র আয়োজন করে। গৃহের পুরুষ বা নারীরাই এর উদ্যোক্তা এবং পূজক। এর তিনটি পর্যায় -- মই খুঁটি প্রতিষ্ঠা, খেত মাড়ান এবং 'সাঁথ ধরা'। এটি মেহি পূজার মতই এক লোকাচার। খেত মাড়ান পর্বে চাষের জমিতে রক্ষিত একগুচ্ছ ধান গাছের ('ঝুঁটি') গোড়ায় 'লবাত্' (নতুন ধানের চাল বেটে প্রস্তুত মিষ্টান্ন) ও ফলমূল নৈবেদ্য রেখে সরষে ও সাদা কল্কে ফুল ('শুক্ল যাদু'-র প্রতীক) দিয়ে পুজো করতে হয়। এরপর সেই ঝুঁটি ছিঁড়ে তা মইখুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়। আগামী বছর ভালো ধান হবার এ এক লৌকিক প্রার্থনা। 'সাঁথ ধরা' হল বন্য প্রাণির ডাক শুনে সেই পূজিত 'ঝুটি' সযত্নে ধানের গোলায় তুলে রাখার অনুষ্ঠান। লোকবিশ্বাস, শেয়ালের সাঁথ ধরা সবচাইতে সৌভাগ্যের বিষয়।
রাঢ় অঞ্চলের অনেক স্থানে পৌষ সংক্রান্তির পরদিন তপশিলী সম্প্রদায়ের মানুষ কর্তৃক 'আক্ষেন' বা 'আখ্যান দিন' পালিত হয়। একে 'এখ্যান যাত্রা'-ও বলে। এদিন লোকদেবতা ও অপদেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়। পূজার শেষে আয়োজিত হয় নৃত্য-গীতের অনুষ্ঠান।
অনেক স্থানে এইদিন গ্রামের বালকেরা 'কুলাইর মাগন' বা 'কুলের মাগন' বা 'পৌষ মাগন' পালন করে। তারা আমন ধান উঠে যাবার পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে চাল, ডাল, সবজি মাগন করে আনে তা এইদিন নিজেরাই মাঠে রান্না করে কুলাই ঠাকুরকে নিবেদন করে এবং একত্রে ভোজন করে।
১১. একটি প্রচল কথা হল, "অন্নচিন্তা চমত্কারা"। কৃষকের গোলায় যখন ক্ষুধান্নের মজুত পরিপুষ্টি লাভ করে তখনই আসে শান্তি ও সমৃদ্ধির উত্সব। ফসলোত্তর এই সংক্রান্তি সেই শান্তির বার্তাই নিয়ে আসে সমগ্র ভারতীয় উপ-মহাদেশে। পশ্চিম ভারতে এটি 'মকর সংক্রান্তি', দক্ষিণের রাজ্যে 'পোঙ্গাল', উত্তর ভারতে 'লোহরি', অসমে 'ভোগালি বিহু'; সুনির্দিষ্টভাবে কর্ণাটকে 'ইল্লুবিল্লা' এবং 'মকর সংক্রমণা', উত্তর প্রদেশে 'খিচড়ি', গুজরাটে 'উত্তরায়ণ', হরিয়াণা, হিমাচল প্রদেশে 'মাঘী', মহারাষ্ট্রে 'তিলগুল', বিহার-ঝাড়খন্ডে 'সকরাত'। সর্বত্রই ফসল তোলা, ঝাড়াই, মাড়াই-এর অবসরে নদী বা সাগরে পুণ্যস্নান; ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী রচনা ও বিতরণ; নববস্ত্র পরিধান আর সূর্যদেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উত্সব।
প্রয়াগ, হরিদ্বার, গড় মুক্তেশ্বর, গঙ্গাসাগর প্রভৃতি স্থানে এই উপলক্ষে জমকালো মেলা বসে। প্রয়াগে কুম্ভ মেলার সূচনা আর শবরীমালায় তীর্থযাত্রার সমাপ্তি। লোকবিশ্বাস, এদিন পরলোকগমন করলে তাকে আর ইহজীবনে ফিরে আসতে হয় না, সরাসরি বৈকুণ্ঠ লাভ হয়।
নানান রাজ্যে 'তিল-গুড়' বা 'তিল-লাড্ডু' এদিনের শীতলতায় এক শক্তিদায়ী উষ্ণ খাবার। দক্ষিণের রাজ্যে তৈরি হয় 'পোঙ্গাল'। তামিল বা তেলেগু ভাষায় শব্দটির অর্থ হল 'হাঁড়িতে ভাত সেদ্ধ করা'। নতুন চাল, ভাজা মুগ, বাদামি আখের গুড়, ইক্ষু-শক্কর, দুধ ও নারকেল দুধের সঙ্গে কিশমিশ, কাজু, এলাচে প্রস্তুত এক সুস্বাদু মিষ্টান্ন।
গুজরাটে এদিন পালিত হয় ঘুড়ি উত্সব। এর প্রতীকি তাত্পর্য অসীম। আপন আকুতি দেবতার কাছে নিবেদনের নান্দনিকতায় রং-বেরঙের ঘুড়ির রূপ ধারন করে তারা আকাশে ওড়ে। তেলেগু গৃহস্থেরা এদিন গৃহের পুরাতন সামগ্রী বিক্রি করে বা আগুন ধরিয়ে 'বন-ফায়ার' করে। পাঞ্জাবীদের মধ্যেও এই প্রথা প্রচলিত আছে। অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানায় গবাদিপশুকে এদিন নানান সামগ্রী ভোজন করানো হয়। গুজরাটে তাদের গায়ে আঁকা হয় নানান রং। এই দিনে জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে স্মরণ-মনন করে মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি দেন গুজরাটি পন্ডিতেরা। অধ্যাত্মিক মনন ও অভ্যাসে এই দিনটি তাই মান্যতা পেয়ে এক সর্ব ভারতীয় উত্সবের মর্যাদা লাভ করেছে; পাপ, অপরিচ্ছন্নতা ও অপবিত্রতা দূরীকরণই যার মূল সুর।
সংগৃহীত

Friday, 16 December 2022

বিশালাক্ষী দেবী

 

প্রসঙ্গঃ-বিশালাক্ষী দেবী
বিশালাক্ষী দেবী মহামায়া সতীর অপর এক রূপ। গ্রাম বাংলায়ও বিশালাক্ষী দেবীর বহুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক অঞ্চলে এই বিশালাক্ষী দেবীর মন্দির রয়েছে।বিশালাক্ষী দেবীর প্রধান মন্দির ভারতের বারাণসী শহরের বিশ্বনাথ মন্দিরের পশ্চাদে মীরঘাটে অবস্থিত। পুরাণ মতে, ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম হল এই বারাণসীর বিশালাক্ষী দেবীর মন্দির।
বাংলার কৃষিজীবী, জলজীবী ও বনজীবী লোকসমাজ তথা সুন্দরবন এলাকাকে বিশালাক্ষী দেবীর অনেক মহিমা রয়েছে। বিশেষত, কৃষক, জেলে, মৌয়ালি-বাওয়ালি পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই দেবীর আরাধনা করেন। কথায় বলে, সুন্দরবনের জঙ্গলমহল যতদূর ছড়িয়ে রয়েছে, এই বিশালাক্ষী দেবীর পুজোর ক্ষেত্রে ততদূর ছড়িয়ে রয়েছে।
কথিত আছে যে, দেবাদিদেব শিব যখন দেবী সতীর দেহ কাঁধে করে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছিলেন, তখন মহাদেবকে শান্ত করতে বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, সেই সময় নাকি দেবীর ছিন্ন ভিন্ন দেহের থেকে দেবীর কর্ণ ও কুণ্ডল এই অঞ্চলে পতিত হয়েছিল। তাই বিশালাক্ষী দেবী এখানে মণিকর্ণি নামে পরিচিত।অনেকে আবার মনে করেন এই কর্ণকুণ্ডল শুধুমাত্র অলংকার, এটি দেহের অংশ একেবারেই নয়। তাই এই মন্দিরকে উপপীঠ বলা যেতেও পারে।আবার অনেকের মতে, এই স্থানে দেবীর তিনটি নয়ন বা চোখের একটি পতিত হয়েছিল। মহামায়া দিব্যচক্ষু দিয়ে সমগ্র বিশ্ব দেখতে পান। তাই এখানে এই দেবী বিশালাক্ষী দেবী নামে পরিচিত।
বিশালাক্ষী মায়ের ধ্যান-
ধ্যায়েদ্দেবীং বিশালাক্ষীং তপ্তজাম্বুনদপ্রভাম্।
দ্বিভুজামম্বিকাং চণ্ডীং খড়গখেটকধারিণীম্।।
নানালংকারসুভগাং রক্তাম্বরধরাং শুভাম্।
সদা ষোড়শবর্ষীয়াং প্রসন্নাস্যাং ত্রিলোচনাম্ ।।
মুণ্ডমালাবলীরম্যাং পীনোন্নতপয়োধরাম্ ।
শবোপরি মহাদেবীং জটামুকুটমণ্ডিতাম্।।
শত্রুক্ষয়করাং দেবীং সাধকভীষ্টদায়িকাম্ ।
সর্বসৌভাগ্যজননীং মহাসম্পদপ্রদাং স্মরেৎ ।।
----তন্ত্রসার
অনুবাদ - মায়ের গাত্র বর্ণ তপ্তকাঞ্চনের মতো, দ্বিভুজায় তিনি খড়গ ও ঢাল ধারণ করে আছেন, মায়ের গাত্রদেশে নানা অলঙ্কার শোভা পাচ্ছে, পরিধানে রক্তবস্ত্র , তিনি সদা সর্বদাই ১৬ বছরের যুবতী থাকেন, তার অনন প্রসন্নতা যুক্ত, তার তিনটি চোখ, তার স্তনযুগল স্থূল ও উন্নত, তার গলায় মুণ্ডমালা সুশোভীত,তিনি শবরূপ শিবের উপর আসিনা, তার মস্তকে জটা ও কিরীট শোভা পাচ্ছে, ইনি সর্বদা সাধকের শত্রুনাশিনী তথা অভীষ্ট বর প্রদান কারিনী, তিনি সব প্রকারের সৌভাগ্যের অধিশ্বরী ও মহাসম্পদ প্রদান কারিনী।

Saturday, 19 November 2022

দশদিক ও দশদিকপাল

 

 


আমরা সকলেই জানি যে আমাদের চারপাশে দিক চারটি। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণ, কিন্তু ছাড়াও আরও চারটি কোণ আছে , এগুলি হল ঈশান, অগ্নি, বায়ু, নৈঋত  কোণ। উত্তর পূর্বের মধ্যস্থান ঈশান, দক্ষিণ-পূর্বের মধ্য স্থান অগ্নি উত্তর-পশ্চিমের মধ্যস্থানকে বায়ু কোণ বলে, এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের মধ্যস্থান নৈঋত্ কোণ নামে পরিচিত। পাশাপাশি আকাশ বা উর্দ্ধ পাতাল বা অধঃ এই সব দিক মিলিয়ে হয় দশ দিক। বাস্তুশাস্ত্রে প্রতিটি দিকের নিজস্ব নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিটি দিকের পৃথক দিকপাল বা অধিপতি দেবতা অধিপতি গ্রহ আছেন। তাই প্রতিটি দিকের পৃথক পৃথক প্রভাব ও আছে। আবার এই দশ দিকের প্রত্যেকের এক এক অধিপতি আছেন। বাস্তুশাস্ত্র মতে চার দিক চার কোণের উপর মানুষের সর্বসিদ্ধি, সমৃদ্ধি কল্যাণের অনেকটাই নির্ভর করে৷  আজ আমি এই বিষয়ে আলোচনা করছি আপনাদের সাথে


উত্তর দিক: বাস্তুমতে উত্তর দিক অত্যন্ত শুভ৷ এই দিকের অধিদেবতা হলেন কুবের, সোম বা চন্দ্র৷ উত্তর দিককে তাই অর্থ পেশাগত উন্নতির দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বুধ হলেন উত্তর দিকের অধিপতি গ্রহ। আমাদের সকলের উচিত ঘরের উত্তর দিক সব সময় খোলামেলা আলোকজ্জ্বল সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা।  

দক্ষিণ দিক: দক্ষিণ দিক খুব একটা খোলামেলা না হওয়াই ভালো। বাস্তুমতে এই দিকের অধিপতি হলেন হিন্দু দেবতা যম। আর এই দিকের প্রতিনিধি গ্রহ হল মঙ্গল। তাই ঘরের দক্ষিণ দিক বেশি খোলামেলা হলে বাড়ির সদস্যদের বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ হতে পারে  এমনকি মৃত্যুভয় থাকবে। দক্ষিণ দিকে খোলামেলা বাড়ির সদস্যরা মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমাতেও জড়িয়ে পড়তে পারেন। দক্ষিণ দিকে বন্ধ দেওয়াল থাকলে ভালো তাহলে অর্থ প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাবে।

পূর্ব দিক:  পূর্ব দিক অত্যন্ত শক্তিশালী দিক বলে গণ্য। এই গ্রহের অধিপতি হলেন দেবরাজ ইন্দ্র। ইন্দ্র বৃষ্টি, প্রতিপত্তি, উৎসব শক্তির দেবতা।পূর্ব দিকের প্রতিনিধি  গ্রহ হলেন সূর্য, যিনি নিজেই শক্তির বিশাল উৎস  সূর্যের প্রভাবে সকলের জীবনে উন্নতি হয়। তাই পূর্ব দিককে আমরা উন্নতির দিক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। বাড়ির পূর্ব  দিকও খোলামেলা, আলোকজ্জ্বল পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। এই দিকে বন্ধ দেওয়াল থাকলে জীবনে উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হবে। বাড়ির পূর্ব দিকে বাথরুম থাকা বাস্তুমতে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত।

পশ্চিম দিক: এই দিক জীবনে প্রতিষ্ঠা সমৃদ্ধির দিক। এই দিকের অধিপতি হলেন বৃষ্টি, খ্যাতি ভাগ্যের দেবতা বিষ্ণু। এই দিকের প্রতিনিধি গ্রহ হলেন শনি। বাড়ির পশ্চিম দিক খুব একটা খোলামেলা রাখা বাঞ্ছনীয় নয়। পশ্চিম দিকে বাড়ির মূল দরজা না হওয়াই ভালো। এতে অর্থলাভের সম্ভাবনা নষ্ট হয়।

ঈশান (উত্তরপূর্ব) - বাস্তুমতে খুবই ভালো দিক। এই দিকের অধিপতি হলেন হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ দেবতা শিব। এর প্রতিনিধি গ্রহ হলেন বৃহস্পতি যিনি ধনসম্পত্তি, প্রতিপত্তি সুস্বাস্থ্য দান করেন। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উত্তরপূর্ব অত্যন্ত শুভ দিক। এই দিক থেকে শক্তিশালী চৌম্বকীয় শক্তি নির্গত হয়। বাড়ির উত্তরপূর্ব দিকে শৌচাগার নির্মাণ  করলে তা গোটা পরিবারকে শেষ করে দিতে পারে। এই দিকে দাহ্যশীল (যা আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে) পদার্থ রাখা উচিত নয়।  

অগ্নি (দক্ষিণপূর্ব) - দক্ষিণপূর্ব দিকের অধিপতি হলেন অগ্নিদেব। এর প্রতিনিধি গ্রহ শুক্র। সূর্য যখন দক্ষিণপূর্ব দিকে আসে্ন, তখন তাঁর মেজাজ অত্যন্ত উগ্র থাকেন। সবথেকে উগ্র অবস্থায় এই সময়ই থাকে্ন সূর্য। এই উগ্র রূপকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আগুন সংক্রান্ত কাজকর্ম এই দিকে করলে ভালো হয়। এই দিকে জিনিসপত্র রাখা নির্মাণ করার সময় সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। এইদিকে রান্নাঘর থাকা ভালো, আর জলের আধার বা জলের ট্যাঙ্ক,পুকুর বা জলাশয়  এদিকে থাকা সেই পরিবারের  অনর্থের কারণ হতে পারে।

নৈঋত (দক্ষিণপশ্চিম) - এই দিকের অধিপতি হল  নৈরিতি নামের এক রাক্ষস। এর প্রতিনিধি গ্রহ রাহু। উত্তরপূর্ব দিক থেকে নির্গত চৌম্বকীয় শক্তি এই দিকে সঞ্চিত হওয়ায় এটাই বাড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। এই দিকের সঠিক ব্যবহার খুবই শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর জীবন দিতে পারে। এই দিক সম্পদ, স্বাস্থ্য আত্মবিশ্বাসের দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাস্তু মেনে ব্যবহৃত হলে দক্ষিণ পশ্চিম দিক খ্যাতি এনে দেবে। কিন্তু ভুল ব্যবহার নানা সমস্যা ডেকে আনতে পারে। অর্থ বেরিয়ে যাবে, হতাশা, উদ্বেগ এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতাও   দেখা দিতে পারে। কর্মক্ষেত্রে দক্ষিণ পশ্চিম দিকের ভুল ব্যবহার কর্মীদের কাজে অমনোযোগের কারণ ও হয়।

 বায়ু (উত্তরপশ্চিম) - এই দিকের অধিপতি হল বায়ু। এর প্রতিনিধি গ্রহ হল চন্দ্র। বাতাস এর মূল উপাদান হওয়ায় এই দিকটি খুবই অস্থির দিক। এই দিকের সঠিক ব্যবহারে জীবনে নানা সুযোগ আসে। পেশাগত জীবনে উন্নতি হতে পারে। তবে বাস্তুমতে এর ভুল ব্যবহার বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এর ফলে অসুখবিসুখও হতে পারে।

আকাশ বা ঊর্ধ্বঃ-আকাশকে ঊর্ধ্ব দিক বলা হয়। ব্রহ্মা দিকের অধিপতি। বাস্তু শাস্ত্রে এই দিকের অধিক মাহাত্ম্য স্বীকার করা হয়। বেদ মতে, কিছু চাইতে হলে ব্রহ্মার কাছ থেকে চাও। তাঁর কাছ থেকে চাইলে সমস্ত কিছু লাভ করা যায়। তাই মনে করা হয় ঊর্ধ্ব দিকে মুখ করে প্রার্থনা করলে তা পূর্ণ হয়। বাস্তু অনুযায়ী বাড়ির আশপাশে বৃক্ষ, বাড়ি, মন্দিরের ছায়া পড়লে বাড়িতে বসবাসকারী ব্যক্তির ওপর প্রভাব পড়ে।

পাতাল বা অধঃ পাতালের দিককে অধো দেশ বলা হয়। এই দিকের অধিপতি শেষনাগ। শেষনাগকে অনন্ত বলা হয়। তাই যে কোনও নির্মাণের আগে ভূমি পুজো করা হয়। বেসমেন্ট, কুয়ো, গোপন পথ ইত্যাদির প্রতিনিধিত্ব করেন শেষনাগ। ছাড়া বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী বাড়ির নীচের বস্তুর প্রভাব বাড়ি তাতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের ওপর পড়ে। তাই গৃহ নির্মাণের পূর্বে সব ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। জমির ভিতরের মাটি হলুদ হলে এটি ভাগ্য বৃদ্ধি করে।

 

 

 

কৌশিকী অমাবস্যা

  ছবি  কৃতজ্ঞতাঃ- গুগল চিত্র পুরাণমতে, কৌশিকী অমাবস্যার শুভতিথিতে পরাক্রমশালী শুভ-নিশুম্ভ অসুর দুই ভাইকে বধ করার সময়েই দেবী পার্বতীর দেহের ...