Tuesday, 11 October 2016

দেবতা বিসর্জন...কিছু কথা




দশমী পূজার সাথে সাথেই সমাপ্তি ঘটলো পাঁচ দিন ব্যাপি শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা আকাশে বাতাসে যেন কেমন বিষাদের পরিবেশ
, মানসিক অবস্থা ও তদ্রূপ। আসলে সেই মানসিক অবস্থার কারণ হল এই কয়েক দিনের বাঁধন ছাড়া আনন্দের অবসান ঘটবে বলে। দেবী কোথায় যাবেন সন্তান কে ছেড়ে তিনি কি যেতে পারেন আর দেবী যদি সত্যি সত্যি চলে যান তাহলে এই জীব সকল কি প্রাণ ধারণ করে থাকতে পারবে? এই মহামায়ার আশীর্বাদের ফলে আমরা বেঁচে আছি। তবে কেন আমরা মন খারাপ করবো? মা এতদিন মণ্ডপে বসে আমাদের পুজা-আরাধনা গ্রহণ করেছেন, আজ পূজার সমাপ্তিতে তিনি আবার আমদের মনের আসনে আমাদের হৃদয়ে ফিরে আসবেন। এই ঘটনা প্রসঙ্গে একটা কাহিনী উল্লেখ্য
'একবার রাণী রাসমণি জানবাজারের বাড়িতে দুর্গাপূজার ব্যাবস্থা করেছেন | জামাই মথুর সারাক্ষণ মায়ের পূজার তদারকি করছেন | এবার এল সেই বিজয় দশমীর দিন | বিসর্জনের সময় হঠাৎই মথুরবাবু হুকুম দিলেন | এই সুন্দর মাকে বিসর্জন দিয়ে পারব না | অসম্ভব, মথুরবাবু শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন | দুখে মনটা যেন ভেঙে যাচ্ছে | সবাই তো একবারে হকচকিয়ে গেছে | কি হবে তাহলে ? মায়ের কি তাহলে বিসর্জন হবে না ? কিন্তু মথুরবাবুর নির্দেশ তাই কেউ ভয়ে অমান্যও করতে পারবে না | এই অবস্থায় একজন মাত্র উদ্ধার করতে পারেন ! আর তিনি হলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব | কারন মথুরবাবু তাঁর কথা কখনও অমান্য করতে পারেন না | সবাই মিলে গিয়ে ধরলেন ঠাকুরকে , এই অবস্থার থেকে উদ্ধার করার জন্য | ঠাকুর এলেন বললেন, ' মথুর এতদিন মা বাইরে পূজা নিলেন এবার তোমার হৃদয়ে বাস করবেন |' মথুরের বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন , ব্যাস মথুরবাবু শান্ত হলেন |'
আমাদের শাস্ত্র ও তাই বলে, পূজার সময় ধ্যান মন্ত্র পাঠ করে হৃদয়স্থিত দেব/দেবী কে ধ্যানের পুস্পের মধ্যে এনে ঘটে স্থাপন করা হয়, আবার পূজার শেষে ঘটের পুষ্পের থেকে দেব/দেবী কে আবার স্ব-হৃদয়ে স্তাপনা করা হয়। তাহলে মা দুর্গা যাচ্ছেন কোথায়?
 বিসর্জনের সময় যারা চিৎকার করে  বলেন ‘ও মা যাইও না...মাগো যাইওনা’ তাঁদের কাছে বিনম্র অনুরোধ এমন আচরণ থেকে বিরত থাকুন ও অন্যদের ও বলুন। এই সকল আচরণ ভিন ধর্মী মানুষদের মনে ও  বাচ্চাদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। আরেকটা বিষয় বিসর্জনের সময় এতো উল্লাস কিসের? সেই উল্লাস দেবতাকে ভাসানোর বা জলে ফেলার নয় সেই উল্লাস নির্বিঘ্নে পূজা যজ্ঞ সম্পাদন করার উল্লাস, আমরা যেকোনো কাজ সফল ভাবে করতে পারলে যে উল্লাস প্রকাশ করি এখানে সেই উল্লাস মাত্র। যদিও কিছু ক্ষেত্রে আজকাল সেই উল্লাস, মাত্রা ছাড়িয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে এবং যার ফলে বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের কাছে তা এক কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।   আমাদের দেহ পঞ্চ তত্ত্ব দিয়ে তৈরি, দেহ থেকে প্রাণ চলে গেলে সেই নিষ্প্রাণ দেহকে হয় অগ্নি দ্বারা দাহ করা হয় নয়তো মাটি চাপা দেওয়া হয়  তার তাৎপর্য এই যে, পঞ্চত্তত্ব দ্বারা তৈরি দেহকে আবার সেই পঞ্চ তত্ত্ব তে বিলীন করে দেওয়া। ঠিক সেই ভাবে মাটি দ্বারা তৈরি প্রতিমা তে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে দেহস্থ দেবতা কে পূজা করা হয়, পূজার শেষে আবার সেই দেবতাকে  স্ব হৃদয়ে স্থাপন করে দেবতা কে করা হয় মন্ত্র বিসর্জন, এবং সেই নিষ্প্রাণ মাটির মূর্তিকে জলে বিসর্জনের মাধ্যমে আবার সেই পঞ্চ-তত্ত্বে মিলিয়ে দেওয়া হয়।

বিসর্জনের এই তত্ত্ব হয়তো অনেকেই জানেন, যাদের কাছে তা অজানা, আমি যতটুকু জেনেছি তা জানিয়ে দেবার চেস্থা করেছি মাত্র। বিসর্জনের সময় তাই অন্য ভাবনা ভুলে দেবতার সেই তেজোময় রূপ আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করছে এমন ভাবনা করুন  এবং প্রার্থনা করুন যেন আগামী এক বৎসর আমাদের  হৃদয়ে বিরাজিত থেকে আমাদেরকে সকল রকম বাধা, বিপত্তি, রোগ, শোক, বিপদ থেকে রক্ষা করেন। এক বৎসর পরে আবার তাঁকে যেন আরাধনা করার সুযোগ ও শক্তি প্রদান করেন আমাদের এই প্রার্থনা করা প্রয়োজন। জয় মা...।

Tuesday, 4 October 2016

দেবী প্রতিমা ও দেবী ধ্যান

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন প্রতিমায় আবির্ভাব হতে গেলে তিনটি জিনিসের দরকার,- “প্রথম পূজারীর ভক্তি, দ্বিতীয় প্রতিমা সুন্দর হওয়া চাই, তৃতীয় গৃহস্বামীর ভক্তি”। আধুনিক কালের পূজাতে সেই ভক্তির অভাব অনেক ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। প্রতিমা পূজার প্রধান অঙ্গ হল প্রতিমা, সেই প্রতিমা সুন্দর না হলে পূজার সার্থকতা থাকে না, আবার প্রতিমা ধ্যানাযায়ী না হলে পূজারীর কাছে পূজা করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় । পূজার সাত্বিকতা হারিয়ে আজ অনেক ক্ষেত্রে তা রাজসিকতা ও তামসিকতায় পরিনত হয়েছে। মাতৃ আরাধনার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আমরা তার আনুসঙ্গিকতায় অধিক মনোনিবেশ করেছি।আজকাল দেবী প্রতিমা আমাদের কাছে মনোরঞ্জনের এক বিষয় বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, অধিকাংশ স্থানে মূর্তি তৈরি করা হয় বিভিন্ন আদলে, বিভিন্ন রূপে যার ফলে আমরা নিজেরা মাতৃ রূপ সম্বন্ধে বিভ্রান্ত। সত্যি কথা বলতে কি আমরা অনেকেই জানি না আমাদের জগন্মাতা দেবী দুর্গার প্রকৃত স্বরূপ কি? ধ্যানে আমরা দেবীর যে রূপ বর্ণিত পাই তা আমাদের অনেকের কাছে অজানা তাই আজ যেখানে যেখানে সেই ধ্যানে বর্ণিত রূপে প্রতিমা তৈরি হয় তা আমাদের মনোগ্রাহী হয় না বরঞ্চ আমাদের কাছে কৌতূহলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ধ্যানে শুধু মায়ের রূপের বর্ণনাই নয়, মার কোন হস্তে কোন অস্ত্র তার ও বর্ণনা আছে। সকলের জ্ঞাতার্থে দেবীর ধ্যান মন্ত্র ও তার যথাসাধ্য অর্থ সকলের কাছে তুলে ধরছি,ভুল ভ্রান্তি ক্ষমা করবেন নিজের অজ্ঞতার জন্য আমি নিজেই ক্ষমাপ্রার্থী।
             দেবী দুর্গার ধ্যানমন্ত্র
ওঁ হ্রীং জটাজুটসমাযুক্তামর্দ্ধেন্দুকৃতশেখরাম্।
লোচনত্রয়সংযুক্তাং পূর্ণেন্দুসদৃশাননাম্।।
অতসীপুষ্পবর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্।
(তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্।)
নবযৌবন-সম্পন্নাং সর্ব্বাভরণ-ভূষিতাম্।।
সূচারুদশনাং তদ্বৎ পীনোন্নত-পয়োধরাম্।
ত্রিভঙ্গস্থানসংস্থানাং মহিষাসুরমর্দ্দিনীম্।।
মৃণালায়াত-সংস্পর্শ-দশবাহুসমন্বিতাম্।
ত্রিশুলং দক্ষিণে ধ্যেয়ং খড়্গং-চক্রং ক্রমাদধঃ।।
তীক্ষ্ণবাণং তথাশক্তিং দক্ষিণেন বিচিন্তয়েৎ।
খেটকং পূর্ণচাপঞ্চ পাশমঙ্কুশমেবচ।।
ঘণ্টাং বা পরশুং বাপি বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ।
অধস্থান্মহিষং তদ্বদ্ধিশিরস্কং প্রদর্শয়েৎ।।
শিরোশ্ছেদোদ্ভবং তদ্বদ্দানবং খড়্গপাণিনম্।
হৃদিশূলেন নির্ভিন্নং নির্য্যদন্ত্রবিভূষিতম্।।
রক্তারক্তী কৃতাঙ্গঞ্চ রক্তবিস্ফুরিতেক্ষণম্।
বেষ্টিতং নাগপাশেন ভ্রূকুটিভীষণাননম্।।
সপাশবামহস্তেন ধৃতকেশঞ্চ দুর্গয়া।
বমদ্রুধিরবক্ত্রঞ্চ দেব্যাঃ সিংহং প্রদর্শয়েৎ।।
দেব্যাস্তু দক্ষিণং পাদং সমং সিংহোপরিস্থিতম্।
কিঞ্চিদূর্দ্ধং তথা বামমঙ্গুষ্ঠং মহিষোপরি।।
স্তুয়মানঞ্চ তদ্রূপমমরৈঃ সন্নিবেশয়েৎ।
প্রসন্নবদনাং দেবীং সর্ব্বকাম ফলপ্রদাং।।
উগ্রচণ্ডা প্রচণ্ডা চ চণ্ডগ্রাচণ্ডনায়িকা।
চণ্ডাচণ্ডবতী চৈব চণ্ডরূপাতিচণ্ডিকা।।
অষ্টাভিঃ শক্তিভিস্তাভিঃ সততঃ পরিবেষ্টিতাম্।
চিন্তয়েজ্জগতাং ধাত্রীং ধর্মকামার্থমোক্ষদাম্।।
ব্যাখ্যা
দেবীর মাথায় জটা, সাথে অর্ধচন্দ্রের মত কপাল। পূর্ণিমার চাঁদের মত মুখ তাঁর ও গায়ের রঙ অতসীফুলের মতো। তিনি সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এবং তাঁর সর্বাঙ্গ বিভিন্ন অলঙ্কার দ্বারা ভূষিত।
তাঁর দাঁত সুন্দর এবং ধারালো, স্তন সম্পূর্ণ। তিন ভাঁজে দাঁড়িয়ে তিনি দৈত্য নিধন করছেন। দশহাতভর্তি অস্ত্র তাঁর যা দেখতে শাখা-প্রশাখা সমন্বিত পদ্ম গাছের মতো। ডানদিকের উপরের হাতে অবস্থান করে ত্রিশুল, তারপর ক্রমান্বয়ে খর্গ এবং চক্র।
দেবীর দক্ষিণের সর্বনিম্ন দুই হাতের অস্ত্র ধারালো তীর এবং বর্শা। দেবীর ধ্যানে বর্ণিত হয় তাঁর বাঁ হস্ত। সেদিকে সবচেয়ে নিচের হাতে থাকে চামড়ার ঢাল ও তার উপরের হাতে ধনুক। সেগুলির উপরের হাতে থাকে সর্প, অঙ্কুশ এবং কুঠার (ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে)। দেবীর পায়ের কাছে দৈত্যরাজের মাথার স্থান।
মহিষের কাটা মাথা থেকে মহিসাসুরের দেহ অর্ধেক উত্থাপিত, হাতে তাঁর খর্গ এবং হৃদয়ে দেবীর ত্রিশূল দ্বারা বিদ্ধ। তাঁর পেট থেকে নাড়িভূঁড়ি নির্গত হয়েছে। শরীর রক্তলিপ্ত। দেবীর হাতে ধরা সাপ দ্বারা অসুরের দেহ বেষ্টিত। তবে উত্থিত ভ্রূ তে দৈত্যের রূপও ভয়ঙ্কর। ।
দেবী তাঁর বাম হাত দিয়ে দৈত্যরাজের চুল টেনে রেখেছেন। দেবীর ডান পা বাহন সিংহের উপরে এবং বাঁ পা কিঞ্চিৎ উর্ধে মহিষের উপরে অবস্থান করে। প্রবল যুদ্ধরত অবস্থাতেও দেবী তাঁর শান্তিপূর্ণ মুখাবয়ব ও আশীর্বাদী রূপ বজায় রেখেছেন এবং সমস্ত দেবতা দেবীর এই রূপের স্তুতি করেন। ।
দেবীর উপরোক্ত রূপ দেবতাদের আট শক্তি উগ্রচন্ডা, প্রচন্ডা, চন্ডোগ্রা, চন্ডনায়িকা, চন্ডা, চন্ডবতী, চন্ডরূপ ও অতিচন্ডিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত। গৃহকর্তার মানব জীবনের সমস্ত ইচ্ছা পূর্ণ করেন এই দেবী। তাই ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ লাভের জন্য জগন্মাতৃকা দেবী দুর্গার ধ্যানই মানবজাতির করা উচিত। ।

Wednesday, 21 September 2016

পিতৃতর্পণ ... কিছু কথা... কিছু জানবার বিষয়।


ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পরের তিথি অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে পরের অমাবস্যা বা মহালয়ার দিন পর্যন্ত দিনগুলিকে পিতৃপক্ষ বলে জানা যায়।এই পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পন করা হয়। বিস্বাস যমালয় থেকে মর্ত্যলোকে এ সময় পিতৃ পুরুষেরা আসেন তাঁদের বংশধরের কাছে এবং তাদেরকে তৃপ্ত করার জন্য তিল ও জল দান করা হয়। তাহাদের যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য উল্কাদান করা হয়। মহাভারতে বর্ণিত আছে যে, মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হল শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। তার কারণ কর্ণ ইন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বললেন যে যেহেতু তিনি সারাজীবন সোনাদানাই দান করেছেন এবং পিতৃপুরুষকে জল দান করেননি। তাই তার এই অবস্থা। তাতে কর্ণ বলেন, যে এতে তাঁর কী দোষ?তাঁর  পিতৃপুরুষের কথা তো তিনি জানতে পারলেন যুদ্ধ শুরুর আগের রাতে, যখন মা কুন্তী  এসে তাঁর জন্ম কাহিনিও পরিচয়।তারপর যুদ্ধে ভাইয়ের হাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। সেই কারনে পিতৃতর্পণ তিনি করতে পারেন নাই  যখন ইন্দ্র বুঝলেন যে এতে কর্ণের কোন দোষ নেই। তাই তিনি কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দেন  ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ মর্ত্যে অবস্থান করে পিতৃপুরুষকে অন্নজল প্রদান করে নিজের নিজের পাপ দূর করেনএবং সেই পক্ষটি পরিচিত হল পিতৃপক্ষ নামে। 
মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। পিতৃতর্পণে আমরা যাদের উদ্দেশ্যে  জল দান করে থাকি তা কিছুটা এই রকম...

প্রথমে আমরা করি দেব তর্পণ  এই মন্ত্রে 

ওঁ ব্রহ্মা তৃপ্যতাম। ওঁ বিষ্ণুস্তৃপ্যতাম্।ওঁ রুদ্রস্তৃপ্যতাম্। ওঁ প্রজাপতিস্তৃপ্যতাম্। 

এই চার জন ছাড়া ও অন্যান্য দেবতাদের উদ্দ্যশ্যে ও তর্পণ করা হয় এই মন্ত্রে...

ওঁ নমঃ দেবা যক্ষাস্তথা নাগা, গন্ধবর্বাপ্সরসোহসুরাঃ।
ক্রুরাঃ সর্পাঃ সূপর্ণাশ্ঢ, তরবো জিহ্মগাঃ খগাঃ ।।
বিদ্যাধরা জলাধারা-স্তথৈবাকাশগামিনঃ ।
নিরাহারাশ্চ যে জীবাঃ পাপে-ধমের্ম রতাশ্চ যে ।
তেষাং আপ্যায়নায়ৈতৎ, দীয়তে সলিলং ময়া ।।
যারঅর্থ হল দেব, যক্ষ, নাগ, গন্ধবর্ব, অপ্সরা, অসুর, ক্রুরস্বভাব জন্তু, সর্প, সুপর্ণ যা হল গরুড়জাতীয় পক্ষী  বৃক্ষ, সরীসৃপ, সাধারন পক্ষী, বিদ্যাধর কিন্নর, জলচর, খেচর, ভূত  এবং পাপে ও ধর্মকার্য্যেরত যত জীব আছে, তাহাদের তৃপ্তির জন্য আমি এই জল দিতেছি ।

তারপরে মনুষ্য তর্পণ করা হয় এই মন্ত্রেঃ-

ওঁ নমঃ সনকশ্চ সনন্দশ্চ, তৃতীয়শ্চ সনাতনঃ .
কপিলশ্চাসুরিশ্চৈব, বোঢ়ুঃ পঞ্চশিখস্তথা ।
সর্বেব তে তৃপ্তিমায়ান্তু, মদ্দত্তে-নাম্বুদা সদা ।।
অর্থাৎ সনক, সনন্দ, সনাতন, কপিল,আসুরি, বোঢ়ু ও পঞ্চশিখ আপনারা সকলে আমার প্রদত্ত জলে সর্বদা তৃপ্তিলাভ করুন।
আমরা মরীচি, অত্রি,অঙ্গিরা,পুলস্ত,পুলহ, ক্রতু,প্রচেতা, বশিষ্ঠ, ভৃগু ও নারদ প্রভৃতি ঋষি গনের তর্পণ করি এই মন্ত্রে
ওঁ মরীচিস্তৃপ্যতাং, ওঁ অত্রিস্তৃপ্যতাং,ওঁ অঙ্গিরাস্তৃপ্যতাং,ওঁপুলস্তস্তৃপ্যতাংওঁ পুলহস্তৃপ্যতাংওঁ ক্রুতুস্তৃপ্যতাং,  ওঁ প্রচেতাস্তৃপ্যতাং,ওঁ বশিষ্ঠস্তৃপ্যতাংওঁ ভৃগুস্তৃপ্যতাং, ওঁ নারদস্তৃপ্যতাং।

দিব্য-পিতৃ-তর্পণে আমরা এই সাতটি মন্ত্র দ্বারা প্রত্যেককে এক অঞ্জলি সতিল জল দান করে থাকি  
ওঁ অগ্নিষ্বত্তাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ সৌম্যাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ হবিষ্মন্তঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ উষ্মপাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ সুকালিনঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ বর্হিষদঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।
ওঁ আজ্যপাঃ পিতরস্তৃপ্যন্তা- মেতৎ সতিল-গঙ্গোদকং তেভ্যঃ স্বধাঃ ।

তার পর যমের উদ্দেশ্যে  জল দান করা হয় এই মন্ত্র উচ্চারণ করে
ওঁ নমঃ যমায় ধর্মরাজায়, মৃত্যবে   চান্তকায় চ, বৈবস্বতায় কালায়, সর্ব্বভূতক্ষয়ায় চ ।
 ঔডুম্বরায় দধ্নায়, নীলায় পরমেষ্ঠিনে, বৃকোদরায় চিত্রায়, চিত্রগুপ্তায় বৈ নমঃ 

তারপর পিতৃ- আবাহন করা হয় এই মন্ত্রে
ওঁ আগচ্ছন্তু মে পিতরঃ ইমং গৃহ্ণন্ত্বপোহঞ্জলিং । 

অর্থাৎ  হে আমার পূর্ব্বপুরুযগণ  আসুন, এই অঞ্জলি পরিমিত জল গ্রহণ করুন।
                                      তারপর  ভক্তিসহকারে স্বর্গত পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী, মাতামহী, প্রমাতামহী, বৃদ্ধপ্রমাতামহী, গুরু, জ্যেঠা, খুড়া, বিমাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী, জ্যেঠী, খুড়ী, পিসি,মাসী, মাতুল, মাতুলানী, শ্বশুর, শাশুড়ী, ভগ্নিপতি, জ্ঞাতি, আদি সকলের নামে তর্পণ করা হয়।
তর্পণের সবচাইতে সুন্দর যে অংশটি যা আমাকে অতিশয় অভিভূত করে সেটা হল আমার বংশে যে সকল জীব অগ্নিদ্বারা দগ্ধ হইয়াছেন, অর্থাৎ যাঁহাদের দাহাদি সংস্কার হইয়াছে  বা  যাঁহারা দগ্ধ হন নাই  অর্থাৎ কেহই তাঁহাদের দাহাদি-সংস্কার কার্য্য করেন নাই  তাঁদের তৃপ্তি ও স্বর্গ লাভের জন্যে এই মন্ত্রে জল দান করা হয়  যেমন- 
ওঁ নমঃ অগ্নদগ্ধাশ্চ যে জীবা, যেহপ্যদগ্ধাঃ কুলে মম ।
 ভূমৌ দত্তেন তৃপ্যন্তু, তৃপ্তা যান্ত পরাং গতিং ।। 

এবং যে সকল আমাদের বন্ধু ছিলেন, এবং যে সকল আমার বন্ধু নন, যে সকল জন্ম-জন্মান্তরে আমাদিগের বন্ধু ছিলেন, এবং যারা আমাদের নিকট হইতে জলের প্রতাশা করেন, তাঁদের সম্পূর্ণরূপে তৃপ্তি লাভের জন্যে এই মন্ত্রে তর্পণ...
ওঁ নমঃ যে বান্ধবা অবান্ধবা বা, যে অন্য জন্মনি বান্ধবাঃ ।
 তে তৃপ্তিং অখিলাং যান্ত, যে চ অস্মৎ তোয়-কাঙ্খিণঃ ।। 

তারপর করা হয় ভীষ্ম-তর্পণ এই মন্ত্রে...

ওঁ নমঃ বৈয়াঘ্রপদ্য গোত্রায় ,সাঙ্কৃতিপ্রবরায় চ ।
 অপুত্রায় দদাম্যেতৎ সলিলং ভীষ্মবর্ম্মণে ।।
ওঁ নমঃ ভিষ্মঃ শান্তনবো  বীরঃ , সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয়ঃ ।
 আভিরদ্ভি- রবাপ্নোতু, পুত্র-পৌত্রৌচিতাং ক্রিয়াং ।।


অর্থাৎ  বৈয়াঘ্রপদ্য যাঁহার গোত্র,সাঙ্কৃতি যাঁহার প্রবর, সেই অপুত্রক ভীষ্মবর্ম্মাকে এই জল দিতেছি।শান্তনু-তনয় বীর, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ভীষ্মবর্ম্মা এই জল দ্বারা পুত্র-পৌত্রচিত তর্পণাদি-ক্রিয়া-জনিত তৃপ্তি লাভ করুন ।
ভীষ্ম-তর্পণের পর করা হয় রাম-তর্পণ, সম্পূর্ণ তর্পণ করা সম্ভব না হলে  শুধু এই তর্পণ  করলেই হয়।শ্রীরামচন্দ্র বনবাস কালে এই মন্ত্রেই তর্পণ করেছিলেন বলে কথিত।
মন্ত্রটি হল,
ওঁ নমঃ আ ব্রহ্মভুবনাল্লোকা, দেবর্ষি-পিতৃ-মানবাঃ ,
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে , মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ ।
অতীত-কুলকোটীনাং, সপ্তদ্বীপ-নিবাসিনাং ।
ময়া দত্তেন তোয়েন, তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ং ।।


যার অর্থ হল- ব্রহ্মলোক অবধি যাবতীয় লোক সমীপে অবস্থিত জীবগণ,যথা যক্ষ, নাগাদি, দেবগণ, যথা ব্রহ্মা , বিষ্ণু, শিব প্রভৃতি, ঋষিগণ যথা মরীঢি, অত্রি, অঙ্গিরাদি, পিতৃগণ,মনুষ্যগণ সনক, সনন্দ প্রভৃতি, পিতৃ-পিতামহাদি এবং মাতামহাদি সকলে তৃপ্ত হউন ।আমার কেবল এই জন্মের নয়, আমার বহুকোটিকুল, বহু জন্মান্তরে গত হইয়াছেন, সেই সকল কুলের পিতৃ-পিতামহাদি, সপ্তদ্বীপবাসী যথা জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলি, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাক, পুষ্কর, সমুদয় মানবগণের পিতৃ-পিতামহাদি এবং ত্রিভুবনের যাবতীয় পদার্থ আমার প্রদত্ত জলে তৃপ্ত হউন।
তারপরে করা হয় লক্ষণ-তর্পণ, রাম-তর্পণেও অশক্ত হইলে সকলে এই তর্পণ করা হয়, কারণ বনবাসকালে রাম ও সীতার সেবায় ব্যাস্ত থাকার সময় সময়াভাবে, লক্ষণ এই মন্ত্রে তর্পণ করতেন ।
ওঁ নমঃ আব্রহ্মস্তস্বপর্য্যন্তং জগৎ তৃপ্যতু ।
বাংলায় যার অর্থ হলব্রহ্মা হইতে তৃণ পর্ষ্যন্ত জগৎ , জগতের লোকে, স্থাবর জঙ্গমাদি, সকলে তৃপ্ত হউন।

তারপর বস্ত্র নিংড়ানো জলে যাঁহাদের কেহ কোথাও নাই তাঁহাদের তর্পণ করা হয় এই মন্ত্রে 
ওঁ নমঃ যে চাস্মাকং কুলে জাতা, অপুত্রা-গোত্রিণো মৃতাঃ ।
তে তৃপ্যন্তু ময়া দত্তং, বস্ত্র-নিষ্পীড়নোদকং ।।

বাংলায় যার অর্থ এই দাঁড়ায় যাঁহারা আমাদের বংশে জন্মিয়া পুত্রহীন ও বংশহীন হইয়া গত হইয়াছেন, তাঁহারা আমার এই  বস্ত্র-নিংড়ানো জলে তৃপ্ত হউন ।
তারপর  পিতৃস্তুতি করা হয়  যার মন্ত্র হল
ওঁ নমঃ পিতা-স্বর্গঃ পিতা-ধর্ম্মঃ, পিতাহি পরমং তপঃ ।
পিতরি প্রীতি-মাপন্নে, প্রীয়ন্তে সর্ব্ব-দেবতা ।।

যার অর্থ, পিতাই স্বর্গ, পিতাই ধর্ম্ম, পিতাই পরম তপস্যা অর্থাৎ পিতা সেবাই তপস্যা, পিতা প্রসন্ন হইলে সকল দেবতাই প্রীত হন ।
এবং পিতৃপ্রণাম করা হয় এই মন্ত্রে
ওঁ নমঃ পিতৃন্নমস্যে দিবি যে চ মূর্ত্তাঃ,
 স্বধাভুজঃ কাম্যফলাভিসন্ধৌ প্রদানশক্তাঃ সকলেপ্সিতানাং,
বিমুক্তিদা যেহনভিসংহাতেষু 
ওঁ নমঃ পিতৃন্নমস্যে দিবি যে চ মূর্ত্তাঃ

অর্থাৎ  যাঁহারা স্বর্গে মূর্ত্তি ধারণ করিয়া বিরাজ করিতেছেন, যাঁহারা শ্রাদ্ধান্ন ভোজন করেন, অভীষ্ট-ফলের কামনা করিলে যাঁহারা সকল বাঞ্ছিত-ফল দান করিতে সমর্থ এবং কোন ফলের কামনা না করিলে যাঁহারা মুক্তি প্রদান করেন , সেই পিতৃগণকে প্রণাম করি ।
এরপর সূর্য্যদেবের উদ্দেশে পূর্ব্বদিকে মুখ করে জল দেয়া হয় এই মন্ত্রে
 ওঁ নমো বিবস্বতে ব্রহ্মণ, ভাস্বতে বিষ্ণু তেজসে ।
জগৎসবিত্রে শুচয়ে, সবিত্রে কর্ম্মদায়িণে,
 ইদমর্ঘ্যং ওঁ শ্রীসূর্য্যায় নমঃ ।।

অর্থাৎ  হে পরম ব্রহ্মস্বরূপ সবিত্রিদেব ! আপনি তেজস্বী, দীপ্তিমান ; বিশ্বব্যাপী তেজের আধার, জগতের কর্ত্তা, পবিত্র, কর্ম্মপ্রবর্ত্তক; আপনাকে প্রণাম করি ।।
সূর্য্য-প্রণাম করা হয় এই মন্ত্রে

ওঁ নমঃ জবাকুসুম-সংঙ্কাশং, কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ।
ধ্বান্তারিং সর্ব্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরং ।।

বাংলায় যার অর্থ হল জবাফুলের ন্যায় রক্তবর্ণ,কশ্যপের পুত্র, অতিশয় দীপ্তশালী, তমোনাশী, সর্ব্বপাপ নাশকারী দিবাকরকে প্রণাম করি ।।
সর্বশেষে অচ্ছিদ্রাবধারণ,বৈগুণ্য-সমাধান ও জপের দ্বারা তর্পণের সমাপ্তি করা হয়।
পরিশেষে এতটুকুই বলা যায় যে তর্পণ, পূর্বপুরুষ দের সাথে পরবর্তী প্রজম্মের এক পরিচয় পর্ব অনুষ্ঠান। যার মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষ দের স্মরণ করতে পারি, যাদের সাহায্যে আমাদের এই মানবদেহ অর্জন তাঁদের প্রতি আমরা এই সামান্য জল ও তিলের দ্বারা কৃতজ্ঞতা প্রদান। এই তিল-জল দানে তাঁদের কতটুকু তৃপ্তি লাভ হয় সেটা হয়তো অনেকের কাছে তর্কের বিষয়, কিন্তু আমাদের মনের কোনে হয়তো বা এই আচার কিছুটা তৃপ্তি বোধ আনে। তবে আজকাল অনেক আচার-অনুষ্ঠানই লুপ্ত প্রায় তার মধ্যে  এই পক্ষে কিছু সংখ্যক মানুষের তর্পণের আগ্রহ দেখে মনে হয় এখনও আমাদের কাছে আমদেরই পূর্বজের কিছু আচার অনুষ্ঠান সমাদৃত আছে। তবে তা কতদিন থাকবে সেটাই বিচার্য। তর্ক- যুক্তির প্রভাবে কোনদিন এই তর্পণ অনুষ্ঠান ও হারিয়ে যাবে আমাদের সমাজ থেকে।

       ভগবান সবার মঙ্গল করুন।

কৌশিকী অমাবস্যা

  ছবি  কৃতজ্ঞতাঃ- গুগল চিত্র পুরাণমতে, কৌশিকী অমাবস্যার শুভতিথিতে পরাক্রমশালী শুভ-নিশুম্ভ অসুর দুই ভাইকে বধ করার সময়েই দেবী পার্বতীর দেহের ...