Sunday, 4 November 2018

ধনতেরাস












ধনতেরাস
সংকলকঃ শ্রী দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পালিত ধনতেরাস আসলে আর কিছু নয় ধনাত্রয়োদশী বা ধনবত্রী ত্রয়োদশী। আমাদের সনাতন ধর্মের চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে কার্ত্তিক মাসের তেরোতম দিন অর্থাৎ ত্রয়োদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। এর নেপথ্যে পুরাণের মধ্যেই অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। যেমন
পুরাণে আছে হিম রাজা ও তাঁর ষোলো বছরের পুত্রের কাহিনী।
রাজপুত্রের কোষ্ঠী অনুসারে রাজপুত্রের বিয়ের পরেই সাপের কামড়ে মৃত্যু যোগ ছিলো। যেমনটা আমরা মনসামঙ্গলে বেহুলা লক্ষ্মীন্দরের গল্পে পাই। এই ব্যাপারটি নব-বধুর কানে আসতেই বিয়ের রাতে সেই নববধু রত্নালঙ্কারের জৌলুসে যমের সঙ্গী সাপের চোখ ধাঁধিয়ে রাখার জন্যে ধনরত্ন, নুতন বাসন সামগ্রী বাসর ঘরের প্রবেশ দ্বারে সাজিয়ে রেখেছিলেন। সেই বিস্বাসে আজও নিজের ঘর ও পরিবার পরিজনদের সুরক্ষিত রাখতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধনতেরাস উদযাপন করা হয় আর সন্ধ্যাতে যে দীপ জ্বালানো হয় তাকে বলা হয় যমদীপদান।
আবার আরেক পুরাণে আছে, 
একসময় দুর্বাসা মুনির অভিশাপে ধন ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মী শ্রীহীন ও গৃহহারা হয়ে যান যার ফলে সমগ্র স্বর্গরাজ্যে অন্ধকার নেমে আসে, এরপর যখন দেবতারা অসুরদের সাথে সমুদ্রমন্থন করেন সেই সময় স্বর্গের দেবী মা লক্ষ্মীকে ফিরে পেয়েছিলেন আর সেই দিন ছিলো কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী, সে থেকে এই তিথিতে ধনতেরাস পালিত হয়, ধন সৌভাগ্যাদির আশায়।

......আবার পুরাণের আরেক গল্পে আছে, ইন্দ্রের অভদ্র আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে মহর্ষি দুর্বাসা তিন লোককে শ্রীহীন হওয়ার অভিশাপ দেন। এর ফলে পৃথিবী থেকে নিজের লোকে গমন করেন অষ্টলক্ষ্মী। জগৎ সংসারে শ্রী প্রতিষ্ঠার জন্য সমুদ্র মন্থনের পরামর্শ দেন শিব। দেবতা ও অসুরেরা মিলে তখন সমুদ্র মন্থন করছিলেন আর সেই সমুদ্র মন্থনের সময় হাতে অমৃত কলশ নিয়ে ধন্বন্তরী প্রকট হয়েছিলেন এই তিথিতেই। কথিত, সমুদ্র মন্থনের ফলে চৌদ্দটি প্রমুখ রত্নের উৎপত্তি হয়। চতুর্দশ রত্ন হিসেবে স্বয়ং অমৃত কলশ নিয়ে ধন্বন্তরী প্রকট হন। আর সেইদিনই পালিত হয় ধনতেরাস আর এর ঠিক দুদিন পর প্রকট হন মহালক্ষ্মী। তাই ধনতেরাসের দুদিন পর দীপাবলীতে মহালক্ষ্মী পুজো করা হয়।
বিষ্ণু ধন্বন্তরীকে দেবতাদের বৈদ্য এবং বনস্পতি ও ঔষধির অধিপতি নিযুক্ত করেন। তাঁর আশীর্বাদেই সমস্ত বৃক্ষ ও বনস্পতির মধ্যে রোগনাশক শক্তির সঞ্চার হয় বলে বিশ্বাস।
সমুদ্র মন্থনের সময় শরৎ পূর্ণিমায় চাঁদ, কার্তিক দ্বাদশীর দিনে কামধেনু, ত্রয়োদশীর দিনে ধন্বন্তরী ও অমাবস্যার দিনে মহালক্ষ্মীর উৎপত্তি হয়। জনকল্যানের জন্য ধন্বন্তরীই অমৃতময় ঔষধির খোঁজ করেন। তাঁর বংশেই শল্য চিকিৎসার জনক দিবোদাস জন্ম গ্রহণ করেন। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের পুত্র সুশ্রুত তাঁর শিষ্য ছিলেন যিনি আয়ুর্বেদের মহানতম গ্রন্থ সুশ্রুত সংহিতার রচনা করেন।
স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এইদিনে ধন্বন্তরীর উপাসনা করা হয়। এদিন ধন- সমৃদ্ধির জন্য কুবেরেরও পুজো করা হয়। পৌরাণিক ধারণা অনুযায়ী, ধনতেরাসের দিনে বিধি মেনে পুজো করলে ও দীপ দান করলে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে নিশ্চিত মুক্তি পাওয়া যায়।
অপর এক পৌরাণিক গল্প অনুসারে:
এক সময় ভগবান বিষ্ণু নরলোকে বিচরণ করতে এলে, লক্ষ্মীও তাঁর সঙ্গ নেন। লক্ষ্মী স্বভাবত চঞ্চলা তাই তখন বিষ্ণু বলেন, তাঁর কথা মেনে চললেই লক্ষ্মী তাঁর সঙ্গে যেতে পারেন। সেই শর্তে রাজী হয়ে লক্ষ্মী বিষ্ণুর সঙ্গে পৃথিবীতে আসেন।একটি স্থানে এসে বিষ্ণু লক্ষ্মীকে অপেক্ষা করতে বলেন। বলেন, তিনি দক্ষিণ দিকে যাচ্ছেন এবং তাঁর না-আসা পর্যন্ত লক্ষ্মী যেন সেখান থেকে কোথাও না-যান। লক্ষ্মীর মনে দক্ষিণ দিকে বিষ্ণুর গমনের কারণ জানার কৌতূহল জাগ্রিত হয়। এর পর তিনিও বিষ্ণুর পিছু নেন। কিছু দূর এগোনোর পর সরষের খেতে ফুল ফুটে থাকতে দেখে, সেই ফুল দিয়ে লক্ষ্মী শৃঙ্গার করেন ও তার পর ফের অগ্রসর হন। কিছু দূর যাওয়ার পর ইক্ষুর খেত থেকে ইক্ষু তুলে তার রস পান করেন। সে সময় বিষ্ণু সেখানে আসেন ও লক্ষ্মীকে দেখে ক্ষুব্ধ হন। এর পর বিষ্ণু লক্ষ্মীকে অভিশাপ দেন। বলেন, বারণ সত্ত্বেও লক্ষ্মী তাঁর পিছু নেন ও দরিদ্র কৃষকের খেত থেকে চুরির অপরাধ করে বসেন। লক্ষ্মীকে বারো বছর পর্যন্ত কৃষকের সেবা করতে বলে ক্ষীরসাগরের উদ্দেশে প্রস্থান করেন বিষ্ণু। সেইসময় একদিন লক্ষ্মী কৃষকের স্ত্রীকে স্নান করে লক্ষ্মী পুজো ও তার পর রান্না করার কথা বলেন। পুজোর পর কৃষক-পত্নীর সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ হবে বলে জানান লক্ষ্মী। কৃষক-পত্নী তেমনই করেন। ফল স্বরূপ দ্বিতীয় দিনই কৃষকের ঘর অন্ন, রত্ন, ধনে ভরে যায়।
এভাবে ১২ বছর পর্যন্ত আনন্দে কাটে কৃষকের সময়। বারো বছর পর বিষ্ণু লক্ষ্মীকে নিতে এলে কৃষকের স্ত্রী তাঁকে যেতে দেন না। তখন বিষ্ণু জানান, লক্ষ্মীকে কেউ যেতে দিতে চায় না। লক্ষ্মী চঞ্চলা, কোথাও টিকতে পারেন না। তখন লক্ষ্মী ওই কৃষককে জানান, তাঁর কথা মতো চললে, পরিবারে কখনও অর্থাভাব থাকবে না। ধনতেরাসের দিনে ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করার কথা বলেন লক্ষ্মী। এর পর রাতে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে সন্ধাকালে পুজো করতে বলেন। লক্ষ্মী কৃষককে বলেন, একটি রুপোর ঘটে তাঁর জন্য টাকা ভরে রাখতে। তিনি সেই ঘটেই অবস্থান করবেন।

আবার অপর একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, রাজা বলির ভয় থেকে দেবতাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য বিষ্ণু বামন অবতার নেন। এর পর তিনি বলির যজ্ঞ স্থলে পৌঁছন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য বামন রূপী বিষ্ণুকে চিনে ফেলেন। রাজা বলিকে শুক্রাচার্য সাবধান করে বলেন যে, বামন রূপে বিষ্ণু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তাই বামন যা চাইবে, তা যেন দেওয়া না-হয়। কারণ বামন রূপী বিষ্ণু দেবতাদের সহয়াতার জন্য সেখানে প্রকট হয়েছেন। কিন্তু শুক্রাচার্যের কথা অমান্য করে বামন রূপী হরির প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে বামনের তিন পা সমান ভূমি দান করতে রাজি হয়ে যান। শুক্রাচার্য এই দান বিফলে যাওয়ার জন্য লঘু রূপ ধারণ করে বিষ্ণুর কমণ্ডলে প্রবেশ করেন। বামনও শুক্রাচার্যের ছল বুঝতে পেরে নিজের হাতে থাকা কুশকে কমণ্ডলে এমন ভাবে প্রবেশ করান, যার ফলে শুক্রাচার্যের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। 

এর পর বলি বামনকে তিন পা সমান জমি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। বামন নিজের একটি পা দিয়ে সম্পূর্ণ পৃথিবী ও অপর পা দিয়ে অন্তরীক্ষ মেপে নেন। কিন্তু তৃতীয় পা রাখার জন্য কোনও স্থান বেঁচে না-থাকার কারণে রাজা বলি নিজের মস্তক বামন রূপী বিষ্ণুর পায়ের তলায় রেখে দেন। এ ভাবে দেবতারা বলির ভয় থেকে মুক্তি পায়। এই জয়ের উৎসব হিসেবে ধনতেরাস পালিত হয়।

 ধনতেরাসের শুভ লগ্নে সমৃদ্ধি কামনায় গৃহস্থ বাড়িতে কেনা হয় মূল্যবান ধাতু ৷ সমৃদ্ধি লাভের জন্যই ধাতু কেনার প্রচল এই সময় ৷ তার এক প্রচলিত গল্প আছে...।।

কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে ধন্বন্তরীর জন্ম। সাগর মন্থনের সময় লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছিলেন ধন্বন্তরীও. ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী, কিন্তু তাঁর কৃপা পাওয়ার জন্য সুস্থ জীবন ও দীর্ঘ আয়ু দরকার। সাংসারিক সুখ-সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের কামনার জন্য ধন্বন্তরীর ও  পুজো করা হয় এদিন।ধন্বন্তরী যখন সমুদ্র মন্থনের সময় প্রকট হয়েছিলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল অমৃত কলস। আর সেই কারণে ধনতেরাসের সময় বাসন কেনার চল রয়েছে বলে মনে করা হয়, ধনতেরাসের সময় সোনার বা অন্য কোনও ধাতুর গয়না কিনলে তা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়  শাস্ত্রমতে, এই সময় নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী, যেকোনও শুদ্ধ ধাতুই কেনাই মঙ্গলজনক ৷এইদিনে সোনা কেনার চল আছে৷ সোনা না পারলে রুপো বা অন্য কোনও ধাতুও কিনতে দেখা যায়৷ ফলে অনেককে ধনতেরাসের দিনে বাসন কিনতেও দেখা যায়
তবে জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে, বিভিন্ন রাশির জন্য বিভিন্ন ধাতু কেনা উচিত ৷তবেই ধনতেরাস এর প্রকৃত ফললাভ সম্ভব। রাশি অনুযায়ী যেগুলির নির্দেশ আছে তা হল......
মেষ রাশি : সোনা কিনুন ৷ সোনা রাখুন লক্ষ্মীর সামনে ৷
বৃষ রাশি : সোনা ও রুপো কিনে ঠাকুর ঘরে রাখুন৷
মিথুন রাশি : সোনা নতুবা রুপো কিনতে পারেন ৷
কর্কট রাশি : ধনতেরাসে কিনতে পারেন পিতল ৷
সিংহ রাশি : সোনা বা পিতল কিনতে পারেন ৷
কন্যা রাশি : সোনা কিনে রাখুন ঠাকুর ঘরে।
তুলা রাশি : সোনা বা রুপো কিনুন।
বৃশ্চিক রাশি : পিতল কিনুন৷
ধনু রাশি : রুপো কিনুন।
মকর রাশি : রুপো কিনে  রাখুন ঠাকুর ঘরে 
কুম্ভ রাশি :পিতল কিনুন৷
মীন রাশি :  রুপোর কিছু কিনে ঠাকুর ঘরে রেখে দিন ৷
সংসারে সুখ ও শান্তি বজায় রাখতে এদিন অনেকের বাড়িতেই লক্ষ্মী ও গণেশের পুজো করা হয়. ধনতেরাসের দিনে ঘরে প্রদীপ জ্বালাতে হয়. বলা হয়, কৃষ্ণপক্ষের এই তিথিতে যমের নামে পুজো দিলে অকালমৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আবার  ধনতেরাসের দিন অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অর্থবর্ষের সূচনা হয়; তাই সেই দিন অনেকে নতুন বাসন, গয়না প্রভৃতিও কিনে থাকেন এই দিনে। 
উত্তর ও পশ্চিম ভারতের প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরে বাঙ্গালীদের ঘরে ঘরেও  ধনতেরাস উৎসবের প্রচলন দেখা যাচ্ছে৷ তাই তো ধনতেরাসের দিন সোনার দোকানে-দোকানে বাঙ্গালীদেরও অনেক ভিড় জমাতে দেখা যায়৷অনেকের কাছে বাঙ্গালীদের এইসব আচরন আদিখ্যেতা মনে হলেও আমার কিন্তু মন্দ লাগে না, দৈনন্দিন নানা ঝামেলা ও অশান্তির মধ্যে এই সকল দিয়ে যদি একটু মানসিক শান্তির খোঁজ চলে তবে মন্দ কি? আজকাল  তো অনুকরনের যুগ সকল ব্যাপারেই অনুকরন চলছে......  তবে সেই সকল অনুকরন ভালো যে গুলো সমাজের জন্যে ইতিবাচক বার্তা বয়ে নিয়ে আসে...... তাই নয় কি? যদিও আমার ঘরে তেমন কিছু এখনো শুরু হয় নি.........    
(সংগৃহীত)

Sunday, 14 October 2018

নবরাত্রি- শুভ পঞ্চমী তিথি-- দেবী স্কন্দমাতা

Image result for স্কন্দমাতা

 আজ নবরাত্রির পঞ্চম দিন, আজ দেবীর পঞ্চমী বিহিত রূপ হল দেবী স্কন্দমাতা। আজকের এই পূণ্যলগ্নে  সকল কে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

সিংহাসনগতা নিত্যং পদ্মাশ্রিতকরদ্বয়া।
শুভদাস্তু সদা দেবী স্কন্দমাতা যশস্বিনী।।

মাতা দুর্গার পঞ্চম রূপটি স্কন্দমাতা নামে পরিচিত। হয়।দেবাদিদেব মহাদেবের পুত্র হলেন কার্ত্তিক । কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ । ইনি দেবাসুর সংগ্রামে দেবতাদের সেনাপতি ছিলেন। পুরাণাদিতে এঁকে কুমার এবং শক্তিধর বলে এঁর মাহাত্ম্যের বর্ণনা করা হয়েছে। স্কন্দের বাহন ময়ূর, তাই এঁকে ময়ূরবাহনও বলা ভগবতী পার্বতী সেই মহামায়ার একটি রূপ । তাই তিনি স্কন্দের মা অর্থাৎ দেবীর একটি রূপ স্কন্দমাতা নামে পূজিতা । পুরাণাদি তে এই দেবীকে স্কন্দের শক্তি হিসাবে বর্ণনা করা আছে । অর্থাৎ কৌমারী দেবী ও স্কন্দমাতা এক । কোন স্থানে স্কন্দমাতার বাহন ময়ূর ।
দেবী স্কন্দমাতার কথা জানা যায় স্কন্দ পুরাণ থেকে। অসুররাজ তারক বরলাভ করেছিল, কেবল শিব ও দুর্গার পুত্রই তার প্রাণবধে সক্ষম হবে। তাই দেবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে সহজেই দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গরাজ্য কেড়ে নিতে পেরেছিল। এই ঘটনার ঠিক আগেই সতী দেহত্যাগ করেছিলেন, শিবও হয়েছিলেন ধ্যানমগ্ন। তাই দেবতারা দুর্গাকে পুনরায় জন্মগ্রহণ করার অনুরোধ করলেন। দুর্গা শৈলপুত্রী রূপে গিরিরাজ হিমালয়ের গৃহে জন্ম নিলেন। তারপর ব্রহ্মচারিণী রূপে শিবকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য করলেন কঠোর তপস্যা। শেষে শিবের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। তারপর যথাসময়ে জন্ম হল শিব ও দুর্গার পুত্র কার্তিকের। কার্তিকের জন্মের বিবরণ নানা পুরাণে নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। সে সবের উল্লেখ এখানে না করলেও চলবেশুধু এটুকু বলে রাখি, কার্তিকের ছিল ছয়টি মাথা। তাই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ষড়ানন নামে। এই ষড়ানন স্কন্দই তারককে যুদ্ধে পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্কন্দ ও স্কন্দমাতা উভয়েই তারকাসুর বধে দেবতাদের সাহায্য করেছিলেন বলে, মাতাপুত্রের পূজা একসঙ্গে করাই নিয়ম।
নবরাত্রি পূজার পঞ্চম দিনে এঁর আরাধনা করা হয়। সাধকের মন এই দিন বিশুদ্ধ চক্রেঅবস্থান করে।
এঁর বিগ্রহ মূর্তিতে দেখা যায় ভগবান স্কন্দ বালকরূপে এঁর ক্রোড়ে অবস্থান করছেন। স্কন্দমাতৃস্বরূপিণী দেবী চতুর্ভুজা। তিনি দক্ষিণের ওপরের হাতে স্কন্দকে ধরে আছেন এবং নিচের হাতটিকে উপরদিকে করে, তাতে পদ্মফুল নিয়েছেন। বামের উপরিস্থিত হাতটি নিচে নেমেছে বরাভয় মুদ্রারূপে আর নিচের হাতটি উপরে রয়েচে, পদ্মফুল ধারণ করে। স্কন্দমাতা সর্বাঙ্গে শুভ্রবর্ণা এবং পদ্মের উপর উপবিষ্টা, সেইজন্য এঁকে পদ্মাসনা দেবীও বলা হয়। ইনি সিংহকেও বাহনরূপে রাখেন।
নবরাত্র পূজার পঞ্চম দিনের কথায় শাস্ত্রে পুষ্কল মাহাত্ম্য বলা আছে। এই চক্রে চিত্তপ্রতিষ্ঠ সাধকের সমস্ত বাহ্য ক্রিয়া এবং চিত্তবৃত্তি লুপ্ত হয়ে যায়। তিনি বিশুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। তাঁর মন সকল প্রকার লৌকিক, সাংসারিক, মায়িক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পদ্মাসনা মাতা স্কন্দমাতার স্বরূপে সম্পূর্ণভাবে লীন হয়ে যায়। এই সময় সাধককে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে সাধন পথে চলতে হয় এবং সমস্ত ধ্যান-বৃত্তিকে একাগ্র করে যোগপথে অগ্রসর হতে হয়।
মাতা স্কন্দমাতার আরাধনা করলে ভক্তের সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। এই মর্ত্যলোকেই সে পরম শান্তি ও সুখের অনুভব করতে থাকে। মোক্ষের দ্বার তার কাছে নিজে থেকেই সুলভ হয়ে যায়। স্কন্দমাতার উপাসনা করলে বালকরূপ স্কন্দ ভগবানের আরাধনাও স্বতঃই হয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্য শুধু এঁরই আছে। সুতরাং সাধকের স্কন্দমাতার উপাসনায় বিশেষ লক্ষ্য দেওয়া উচিত। সূর্যমণ্ডলের অধিষ্ঠাত্রি দেবী হওয়ায় তাঁর উপাসকগণ অলৌকিক তেজ ও কান্তিসম্পন্ন হন। এক অলৌকিক প্রভামণ্ডল অদৃশ্যভাবে সর্বদাই তাদের চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত থাকে। এই প্রভামণ্ডল সর্বক্ষণ সাধকদের যোগক্ষেম বহন করে।
অতএব আমাদের একাগ্রভাবে মনকে পবিত্র রেখে মায়ের শরণাগত হওয়ার জন্য চেষ্টা করা উচিত। এই ঘোর ভবসাগরের দুঃখ হতে মুক্তিলাভ করে মোক্ষের পথ সহজ করার এর থেকে উত্তম উপায় নেই।


Tuesday, 17 July 2018

মা ষষ্ঠী---পৌরানিক না লৌকিক দেবী.......... শ্রী দেবাশীষ চক্রবর্ত্তী

ছবি সৌজন্যেঃ গুগোল


কিছু দিন আগেই গেলো বাঙ্গালী দের ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত বহু প্রচলিত অনুষ্ঠান অরণ্যষষ্ঠী পূজা, এই ষষ্ঠী পূজাকে সাধারণত জামাই ষষ্ঠী বলা হয়ে থাকে...অধিকাংশ বাঙ্গালী দের ঘরে ঘরে এই পূজা হয়েছে , আবার এই বছর ষষ্ঠীপূজা নিয়ে অনেকের মনে সংশয়ও ছিলো...।তার কারণ আষাঢ় মাস বলে......অনেকের ধারনা আষাঢ় মাসের দুর্বা বুঝি পুজায় আসে না...... অনেকের মতে এই মাসে দূর্বার জল বুঝি মাথায় নিতে নেই।তবে একথা আমাদের জেনে রাখা ভালো যে আমাদের অধিকাংশ পূজা চান্দ্র মাস অনুসারে হয়,তাই এইবার দিন অনুযায়ী আষাঢ় মাস হলেও চান্দ্রমাসানুসারে ছিল জৈষ্ঠ্য মাস আর জামাইষষ্ঠি চান্দ্র জ্যৈষ্ঠ মাসেই হয় তাই দূর্বা নির্বিবাদে ব্যাবহার করা যেতে পারে। বেদে বা পূরাণে ষষ্ঠী দেবীর কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, বেদে ব্রতেরও কোন বিধান পাওয়া যায় না তবে কি ষষ্ঠী দেবী কোন লৌকিক দেবী?
পুরাতন ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন দেবদেবীর আবির্ভাব ঘটে, কিছুক্ষেত্রে ভয়ভীতি আবার কিছু ক্ষেত্রে আনন্দউচ্ছাস প্রকাশের ফল স্বরূপ। যাদের কে আবার দুইভাগ করা যায় দৈবিক ও লৌকিক। লৌকিক দেবদেবীরা লোকসমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত,এদের মধ্যে কারো বা নির্দিষ্ঠ মুর্ত্তি আছে কারো বা প্রতীকী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে গাছ বা পাথর বা অন্য কিছু......ঠিক একই প্রকার আমাদের এই ষষ্ঠীপূজা সন্তানপ্রদায়িনী ও সন্তানের রক্ষার জন্যে মা ষষ্ঠী বিশেষতঃ বাংলায় ঘরে ঘরে পুজিতা।    
ষষ্ঠী দেবী বিশেষত আমাদের গ্রাম্যজীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। ষষ্ঠী শব্দটি এসেছে ষষ্ঠ মানে ছয়, প্রতি মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর আরাধনা করা হয় । স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী দেবী ষষ্ঠী হলেন ব্রহ্মার মানস কন্যা যার অপর নাম দেবসেনা ও কার্তিকের স্ত্রী। আবার মতান্তরে যেহেতু ষষ্ঠী হলেন  দেবী দূর্গার অপর এক রূপ তাই কার্তিকের জননী বা কাত্যায়নী। তাঁর পরিচিতি মিলেছে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ও দেবী ভাগবতে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবীর ভক্ত হিসেবে পরিচিত রাজা প্রিয়ব্রত যিনি ষষ্ঠী পুজো করে তাঁর মৃত সন্তানদের জীবিত অবস্থায় ফিরে পেয়েছিলেন।আর প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী সেই থেকেই নাকি হিন্দু সমাজে প্রতি মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে ষষ্ঠীপুজো প্রচলিত হয়েছে। দেবী ষষ্ঠী সন্তান দায়িনী,সন্তান পালিনী দেবী। বিভিন্ন পুরাণে বর্নিত থাকলেও তিনি কিন্তু বৈদিক দেবী নন আবার তিনি শুধু পৌরাণিক দেবী ও  নন তিনি হলেন লোকদেবী বা আরও প্রাচীন বিভিন্ন ব্রতের দেবী। তাঁকে দেবী দুর্গার সাথে  একীভূত করা হয়েছে। হয়তো বা এইজন্যে মহাষষ্ঠীর সকালেই হয় দেবী দুর্গার সংকল্প।প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতিবিদ আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতানুযায়ী সুদূর প্রাচীন কাল থেকেই সমাজে শিশুরক্ষক দেবীর অস্তিত্ব ছিল।হরপ্পা সভ্যতায় কতকগুলি ক্ষুদ্রাকৃতি মাতৃমূর্তি পাওয়া গেছে।এই দেবীরা ছিলেন মূলত গৃহদেবী।অন্যদিকে নবজাত শিশুর রক্ষয়িত্রী।পরবর্তীকালে এই সমস্ত মাতৃকামূর্তি থেকেই ষষ্ঠীর উদ্ভব।কিন্তু এও ঠিক যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে ষষ্ঠী্র মূর্তি বিশেষ একটা মেলেনি।কবি কৃষ্ণরাম দাসের ষষ্ঠী্মঙ্গলকাব্যের উল্ল্যেখ করে ড.সত্যনারায়ণ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন --উড়িষ্যায় বালেশ্বর জেলা থেকে একটি ষষ্ঠী মূর্তি মিলেছে।দেবীর কোলে শিশুসন্তান।বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ো ও সোনামুখিতে স্থানীয় কুম্ভকারেরা এক ধরণের মাটির পুতুল তৈরী করেন যার নাম ষষ্ঠীপুতুল বা যো পুতুল।এগুলি ষষ্ঠীতলায় মানত হিসাবে দেওয়া হয়। ষষ্ঠীর কোলে এক বা দুই কিম্বা দশের অধিক শিশু থাকে।কালো বা লাল দু'রঙেরই হয়।চোখে মুখে গড়নে প্রত্ন পুতুলের মায়াবি বিন্যাস ও আদিমতার ছাপ।সুতরাং ষষ্ঠীর উপস্থিতি সেই সুপ্রাচীনকালেই।আজও যার অস্তিত্ব টিকে আছে বাংলার পুতুল শিল্পে।
পৌরাণিক দেবী হিসাবে ষষ্ঠী -দুর্গা,লক্ষ্মী,সরস্বতীর মতোই এতে কোন পার্থক্য নেই।তাঁর ধ্যানমন্ত্রের সার কথা হল-গৌরবর্ণা দ্বিভূজা দেবী,উত্তম বসন ও অলঙ্কার পরিহিতা, চন্দ্রাননা ও কৃষ্ণমার্জার বাহনা,পীনোন্নত পয়োধরা।কোলে একাধিক শিশুপুত্র। স্বামী নির্মলানন্দ তাঁর 'দেব-দেবী ও তাদের বাহন'গ্রন্থে লিখেছেন যে বিড়াল হলো প্রজনন শক্তির প্রতীক। প্রাচীন লোকবিশ্বাস অনুযায়ী বিড়ালির দুধ স্ত্রীরোগের ঔষুধি হিসেবে কাজ করে এবং এই সুত্র ধরেই নাকি ষষ্ঠীর বাহন বিড়াল।
মা ষষ্ঠী যেহেতু শিশু রক্ষয়ত্রী ও সন্তানপ্রদায়িনী তাই এই ব্রতের মূল লক্ষ্য হল সন্তানের মঙ্গলকামনা। তাই বারো মাসে বারোটি শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে বিভিন্ন ষষ্ঠীব্রতের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকারে সন্তানের মঙ্গল কামনা,আয়ু বৃদ্ধি, ও সুস্বাস্থের  জন্যে মায়েরা ব্রত রাখেন। সন্তানের জন্মের ষষ্ঠ দিনে যে ষষ্ঠী পুজা করা হয় তা সূতিকা ষষ্ঠীবা ঘাটষষ্ঠী নামে পরিচিত। জন্মের একুশ দিনে আবার যে ষষ্ঠীর পূজা হয় তা একুশে, একুশ্যা বা শুদ্ধষষ্ঠী বলে।
তাছাড়াও বারোমাসে শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে বারটি ভিন্ন নামে ষষ্ঠী পূজা হয়।স্থানভেদে এই পূজা আবার বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন
Ø বৈশাখ মাসেঃ- ধুলাষষ্ঠী, চন্দনষষ্ঠী বা চান্দনী ষষ্ঠী
Ø  জ্যৈষ্ঠমাসেঃ-জামাইষষ্ঠী,অরণ্যষষ্ঠী,স্কন্দষষ্ঠী,বাটাষষ্ঠী
Ø আষাঢ়মাসেঃ- কোড়াষষ্ঠী,কদমষষ্ঠী,কার্দমীষষ্ঠী,কর্দ্দমষষ্ঠী(বিপত্তারিণী)
Ø শ্রাবণমাসেঃ- লোটনষষ্ঠী, লুণ্ঠনষষ্ঠী
Ø ভাদ্রমাসেঃ- মাথানীষষ্ঠী,মন্থনষষ্ঠী,চর্পটাষষ্ঠী,চাপড়াষষ্ঠী, সূর্যষষ্ঠী,অক্ষয়ষষ্ঠী,সরদেশীষষ্ঠী,
Ø আশ্বিনমাসেঃ- দূর্গাষষ্ঠী,বোধনষষ্ঠী
Ø কার্ত্তিকমাসেঃ- কার্ত্তিকষষ্ঠী, নাড়ীষষ্ঠী(ছট পূজা)
Ø অগ্রহায়ণ মাসেঃ- মূলাষষ্ঠী,গুহাষষ্ঠী,মূলকষষ্ঠী,মূলকরূপিণীষষ্ঠী
Ø পৌষমাসেঃ-পাটাইষষ্ঠী,অন্নরূপাষষ্ঠী
Ø মাঘমাসেঃ- শীতলষষ্ঠী
Ø ফাল্গুনমাসেঃ-অষোকষষ্ঠী,গোরূপিণীষষ্ঠী
Ø চৈত্র মাসেঃ- নীলষষ্ঠী,স্কন্দষষ্ঠী।
বারোমাসে বারোটি ষষ্ঠীব্রতের মাধ্যমে এটাই পরিলক্ষিত হয় যে মা ষষ্ঠী মাদূর্গারই এক অন্যরূপ যা মানব্জাতির লোকসমাজে এক অতি প্রিয় পরিচিতি। তিনি বাঙ্গালীদের ঘরে ঘরে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা যিনি সংসারের শিশুদের রক্ষার দায়িত্বভার নিয়েছেন। এক সাধারণ পরিবার সারাবছর যা আহার করে থাকেন মাষষ্ঠীর ভোগেও তাই দেওয়া হয়, কেনই বা দেওয়া হবে না তিনি যে সংসারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। একনজরে দেখে নেই কি ভাবে মাষষ্ঠীর আহার মাস ভেদে পরিবর্তন হয়...... বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে মাকে দেওয়া হয় আম-কাঠাল সহ বিভিন্ন ফলমূল,  আষাঢ় মাসে তেরোফল,তেরোপান,তেরোটি সুপারী, তেরোটি লুচি দিয়ে......শ্রাবণমাসে ঘি,আখের গুড়,ফল,মিষ্টি,ডাব, ঝিঙ্গে,ইত্যাদি...ভাদ্রমাসে চালেরগুড়োর সাথে তাল মিলিয়ে পিঠে,আশ্বিন মাসে আবার ফল-মূল নৈবেদ্য, কার্তিকমাসে  বিভিন্ন শাক-সব্জী,কলার কাদি,আখ ইত্যাদি গোটা জিনিষ,অগ্রহায়ন মাসে একুশটি করে পিঠে,পাটালী,হিমচে আর দেওয়া হয় গুড়াধান, আউশ ধান, পৌষ মাসে পায়েস-পিঠে,মাঘ মাসে ঠান্ডা জিনিষ ও গোটা সেদ্ধ,ফাল্গুন মাসে অশোক ফুল দিয়ে পূজা করা হয় আর চৈত্র মাসে অশোককুড়ি,মুগকলাই,দই।পাকা কলা,লুচি,সুজি ইত্যাদি তবে ভাত খাওয়া চলবে না।
মায়েদের কাছে সন্তানের নির্বিঘ্নে জন্ম ও তাঁর সুরক্ষা এক অতি বিশিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং হয়তো তার জন্যেই অতিমানসে জন্ম নিয়েছেন মাষষ্ঠীর মতো এক দেবী যিনি সন্তানদের আগলে রাখেন এবং সেই দেবীকে খুশী রাখতেই বারো মাসে বিভিন্ন নামে...বিভিন্ন রূপে...বিভিন্ন উপকরণে তার উপাসনা করা হয়ে থাকে। তবে এও সত্যি যে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা,বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, আধুনিক জীবন যাত্রার প্রভাবে এইসব ব্রতাচার......লোকাচার শহরাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেলেও.........গ্রামাঞ্চলে আজও তা বজায় আছে। আজও গ্রামাঞ্চলে বাঙ্গালীদের ঘরে ঘরে এইসব লৌকিক দেবী সাদরে পূজিতা।
আজ এখানেই আমার কলমের ইতি টানছি.........আগামীতে আপনাদের সহযোগিতা পেলে আরো নুতন নুতন বিষয় নিয়ে আপনাদের কাছে আবার আসবো এই আশা রইলো। ভালো থাকবেন.........সুখে থাকবেন।    

Sunday, 10 June 2018

তিথি বিশেষে বর্জনীয় আহার


আমাদের শাস্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন তিথি অনুযায়ী বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে নিষেধ আছে
যেমন
v প্রতিপদ তিথিতে চালকুমড়া,
v দ্বিতিয়াতে বৃহতী (এক প্রকার গোল সাদাবেগুন)। 
v তৃতীয়াতে পটল, 
v চতুর্থীতে মূলা, 
v পঞ্চমীতে বেল,
v  ষষ্ঠীতে  নিমপাতা ,
v সপ্তমীতে তাল, 
v অষ্টমীতে  নারকেল,
v  নবমীতে অলাবু অর্থাৎ লাউ,
v  দশমীতে কলমিশাক, 
v একাদশীতে শিম,
v দ্বাদশীতে পুঁইশাক,
v ত্রয়োদশীতে বার্ত্তাকু বা বেগুন,
v চতুর্দশীতে মাষকালাই খাওয়া উচিত নয়।
এছাড়াও অষ্টমী, চতুর্দ্দশী পুর্ণিমা,অমাবস্যা ও সংক্রান্তিতে মাছ,মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। ভাদ্রমাসে লাউ,মাঘমাসে মূলা ও চৈত্র মাসে শিম খাওয়া নিষিদ্ধ। রবিবারে মাছ,মাংস,মসুর,নিম,আদা ও দুগ্ধজাত খাবার বর্জনীয়।
আচ্ছা আপনাদের কি মনে হয় এগুলো কি নিছক কুসংস্কার?? আমাদের অজ্ঞানতাকে আড়াল করতে আজ আমরা এই গুলিকে কুসংস্কার বলে সহজেই চালিয়ে দেই।  আসলে ভিন্ন ভিন্ন তিথিতে চন্দ্রের আকর্ষণে প্রাণীর শরীরে বিভিন্ন রসের তারতম্য ঘটে,এবং সেই রসের সাথে যে যে  খাবারের রস মিশলে শরীরের অনিষ্ট হতে পারে সেই সকল খাবারই ঐ সকল তিথিতে নিষিদ্ধ। বিভিন্ন তিথিতে শরীরের এই তারতম্য বুঝতে না পারলেও অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে তা বেশ বুঝতে পারা যায়। শরীরে কাটা-ছেড়া, ব্যাথা বা অন্য যে কোন অসুখ থাকলে ঐ দুই তিথিতে বেশ টের পাওয়া যায়। ভাদ্রমাসে লাউ, মাঘমাসে মূলা ও চৈত্রমাসে শিম নিষিদ্ধের কারন হলো সেই সময় সেই সকল গাছ শুকিয়ে পড়ে, ফসল ছিবড়া যুক্ত হওয়ায় হজমে বাধা দেয় ও পেটের অসুখের কারণ হতে পারে।  
রবিবারে মাছ,মাংস,মসুর,নিম,আদা ও দুগ্ধজাত খাবার খেতে বারণ করা হয়েছে, রবিবার সাপ্তাহিক অবকাশের দিন এমন দিনে বাধ্যবাধকতা কি মানতে চায়??? চায় না। আমাদের জিহ্বার চিহিদা পূরনের চাইতে অতি প্রয়োজনীয় কি আর কিছু আছে? যতদিন অব্দি না আমাদের শরীর কোন অসুবিধা দিচ্ছে ততদিন আমরা শরীরের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাই, ঠিক যেমন মধুমেহ (ডাইবেটিস) হলে আমাদের অতি প্রিয় মিষ্টযাত খাবার ও উচ্চ রক্তচাপ জনিত অসুখে তৈলাক্ত খাবার আমরা বর্জন করি।



Friday, 8 June 2018

প্রসঙ্গঃ- ঈশ্বর (সঙ্কলিত তথ্য)





কথামৃতের চতুর্থ পরিচ্ছেদে আমরা পাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কিভাবে মাষ্টারমশাইর অহংকার চূর্ণ করেছিলেন।প্রকৃত পক্ষে এখানে মাষ্টারমশাই উপলক্ষ্য মাত্র মাষ্টারমশাইকে নিদর্শন রেখে ঠাকুর আমাদের দর্পচূর্ণ...আমাদের ভূলধারণার অবশান...করতে চেয়েছেন। দুই তিনটা বই পরে আমাদের মনে হয় আমরা জ্ঞানী হয়ে গেছি কিন্তু ঠাকুর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আসলে জ্ঞানী বলতে কি বোঝায়। ওহো আমি তো ভূলেই গেছি সেই পরিচ্ছেদটা পড়া হয়েছে তো? পড়া না হলে বা মনে না থাকলে আপনাদের সুবিধার্থে এখানে তুলে দিচ্ছি

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

১৮৮২ মার্চ
অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ৷৷

মাস্টারকে তিরস্কার ও তাঁহার অহঙ্কার চূর্ণকরণ
শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) -- তোমার কি বিবাহ হয়েছে?
মাস্টার -- আজ্ঞে হাঁ।
শ্রীরামকৃষ্ণ (শিহরিয়া) -- ওরে রামলাল যাঃ, বিয়ে করে ফেলেছে!
মাস্টার ঘোরতর অপরাধীর ন্যায় অবাক্‌ হইয়া অবনতমস্তকে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। ভাবিতে লাগিলেন, বিয়ে করা কি এত দোষ!
ঠাকুর আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি ছেলে হয়েছে?
মাস্টারের বুক ঢিপঢিপ করিতেছে। ভয়ে ভয়ে বলিলেন, আজ্ঞে, ছেলে হয়েছে।
ঠাকুর আবার আক্ষেপ করিয়া বলিতেছেন, যাঃ, ছেলে হয়ে গেছে!
তিরস্কৃত হইয়া তিনি স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। তাঁহার অহঙ্কার চূর্ণ হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আবার কৃপাদৃষ্টি করিয়া সস্নেহে বলিতে লাগিলেন,
দেখ, তোমার লক্ষণ ভাল ছিল, আমি কপাল, চোখ - এ-সব দেখলে বুঝতে পারি। আচ্ছা, তোমার পরিবার কেমন? বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি?”
[জ্ঞান কাহাকে বলে? প্রতিমাপূজা ]
মাস্টার -- আজ্ঞা ভাল, কিন্তু অজ্ঞান।
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) -- আর তুমি জ্ঞানী?
তিনি জ্ঞান কাহাকে বলে, অজ্ঞান কাহাকে বলে, এখনও জানেন না। এখনও পর্যন্ত জানিতেন যে, লেখাপড়া শিখিলে ও বই পড়িতে পারিলে জ্ঞান হয়। এই ভ্রম পরে দূর হইয়াছিল। তখন শুনিলেন যে, ঈশ্বরকে জানার নাম জ্ঞান, ঈশ্বরকে না জানার নামই অজ্ঞান। ঠাকুর বলিলেন, “তুমি কি জ্ঞানী!মাস্টারের অহঙ্কারে আবার বিশেষ আঘাত লাগিল।
শ্রীরামকৃষ্ণ -- আচ্ছা, তোমারসাকারেবিশ্বাস, নানিরাকারে’?
মাস্টার (অবাক্‌ হইয়া স্বগত) -- সাকারে বিশ্বাস থাকলে কি নিরাকারে বিশ্বাস হয়? ঈশ্বর নিরাকার, এ-বিশ্বাস থাকিলে ঈশ্বর সাকার এ-বিশ্বাস কি হইতে পারে? বিরুদ্ধ অবস্থা দুটাই কি সত্য হইতে পারে? সাদা জিনিস -- দুধ, কি আবার কালো হতে পারে?
মাস্টার -- আজ্ঞা, নিরাকার -- আমার এইটি ভাল লাগে।

শ্রীরামকৃষ্ণ -- তা বেশ। একটাতে বিশ্বাস থাকলেই হল। নিরাকারে বিশ্বাস, তাতো ভালই। তবে এ-বুদ্ধি করো না যে, এইটি কেবল সত্য আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে।
মাস্টার দুইই সত্য এই কথা বারবার শুনিয়া অবাক্‌ হইয়া রহিলেন। এ-কথা তো তাঁহার পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নাই।
তাঁহার অহঙ্কার তৃতীয়বার চূর্ণ হইতে লাগিল। কিন্তু এখনও সম্পূর্ণ হয় নাই। তাই আবার একটু তর্ক করিতে অগ্রসর হইলেন।
মাস্টার -- আজ্ঞা, তিনি সাকার, এ-বিশ্বাস যেন হল! কিন্তু মাটির প্রতিমা তিনি তো নন --
শ্রীরামকৃষ্ণ -- মাটি কেন গো! চিন্ময়ী প্রতিমা।
মাস্টারচিন্ময়ী প্রতিমাবুঝিতে পারিলেন না। বলিলেন, আচ্ছা, যারা মাটির প্রতিমা পূজা করে, তাদের তো বুঝিয়ে দেওয়া উচিত যে, মাটির প্রতিমা ঈশ্বর নয়, আর প্রতিমার সম্মুখে ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে পূজা করা উচিত।

[লেকচার (Lecture) ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ]
শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া) -- তোমাদের কলকাতার লোকের ওই এক! কেবল লেকচার দেওয়া, আর বুঝিয়ে দেওয়া! আপনাকে কে বোঝায় তার ঠিক নাই।! তুমি বুঝাবার কে? যাঁর জগৎ, তিনি বুঝাবেন। যিনি এই জগৎ করেছেন, চন্দ্র, সূর্য, মানুষ, জীবজন্তু করেছেন; জীবজন্তুদের খাবার উপায়, পালন করবার জন্য মা-বাপ করেছেন, মা-বাপের স্নেহ করেছেন তিনিই বুঝাবেন। তিনি এত উপায় করেছেন, আর এ-উপায় করবেন না? যদি বুঝাবার দরকার হয় তিনিই বুঝাবেন। তিনি তো অন্তর্যামী। যদি ওই মাটির প্রতিমাপূজা করাতে কিছু ভুল হয়ে থাকে, তিনি কি জানেন না -- তাঁকেই ডাকা হচ্ছে? তিনি ওই পূজাতেই সন্তুষ্ট হন। তোমার ওর জন্য মাথা ব্যথা কেন? তুমি নিজের যাতে জ্ঞান হয়, ভক্তি হয়, তার চেষ্টা কর।
এইবার তাঁহার অহঙ্কার বোধ হয় একেবারে চূর্ণ হইল।
তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ইনি যা বলেছেন তাতো ঠিক! আমার বুঝাতে যাবার কি দরকার! আমি কি ঈশ্বরকে জেনেছি -- না আমার তাঁর উপর ভক্তি হয়েছে! আপনি শুতে স্থান পায় না, শঙ্করাকে ডাকে!জানি না, শুনি না, পরকে বুঝাতে যাওয়া বড়ই লজ্জার কথা ও হীনবুদ্ধির কাজ! একি অঙ্কশাস্ত্র, না ইতিহাস, না সাহিত্য যে পরকে বুঝাব! এ-যে ঈশ্বরতত্ত্ব। ইনি যা বলছেন, মনে বেশ লাগছে।
ঠাকুরের সহিত তাঁহার এই প্রথম ও শেষ তর্ক।
শ্রীরামকৃষ্ণ -- তুমি মাটির প্রতিমাপূজা বলছিলে। যদি মাটিরই হয়, সে-পূজাতে প্রয়োজন আছে। নানারকম পূজা ঈশ্বরই আয়োজন করেছেন। যার জগৎ তিনিই এ-সব করেছেন -- অধিকারী ভেদে। যার যা পেটে সয়, বা সেইরূপ খাবার বন্দোবস্ত করেন।
এক মার পাঁচ ছেলে। বাড়িতে মাছ এসেছে। মা মাছের নানারকম ব্যঞ্জন করেছেন -- যার যা পেটে সয়! কারও জন্য মাছের পোলোয়া, কারও জন্যে মাছের অম্বল, মাছের চড়চড়ি, মাছ ভাজা -- এই সব করেছেন। যেটি যার ভাল লাগে। যেটি যার পেটে সয় -- বুঝলে?”
মাস্টার -- আজ্ঞে হাঁ।
এবার দেখে নেই এই ঈশ্বর বলতে আমরা কি বুঝি??? ঠাকুরের কথায় আমি ঈশ্বর কে জানার ক্ষুদ্র চেষ্টা করছি মাত্র, আপনারা কি আছেন আমার সাথে??
চলুন তাহলে যাত্রা শুরু করা যাক...
ঈশ্বর শব্দটির সংস্কৃত ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় যে ঈশ্বর শব্দটি হল ঈশ ধাতু বর প্রত্যয় যোগে নিস্পন্ন। ঈশ্বর শব্দের মূল "ঈশ্" এর অর্থ হল,দক্ষ, মালিক,শাসক।  দ্বিতীয় অংশ 'বর' যার আভিধানিক অর্থ হল "সেরা, চমৎকার, সুন্দর, শাসক"। অতএব, যুগপৎভাবে ঈশ্বর শব্দের অর্থ হল; সেরা বা সুন্দরের স্রষ্টা।তাহলে সামগ্রিক ভাবে তার অর্থ এই দাঁড়াল যে যিনি সকলের কর্তা তিনিই ঈশ্বর, তিনি সকল কিছুর নিয়ন্তা। আবার তিনিই এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর। যার কাছে সৃষ্টি,পালনও সংহারের ভার ন্যস্ত। সময়কাল ও শাখাভেদে এর বহু অর্থ। তিনি অনন্তরূপী, অনন্ত গুণের অধিকারী। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ধর্মীয় বইয়ে ঈশ্বর এর নানাবিধ অর্থ, যেমন: সৃষ্টিকর্তা, মহান সত্তা, পরমাত্মা, প্রভু, মহাবিশ্বের শাসক, ধনী শ্রেষ্ঠী ,একাদশ রুদ্রের মধ্যে এক, স্বামী,দেবতা-শিব, দয়াময় এবং রক্ষাকর্তা।কোথাও পরমাত্মাকে আবার কোথাও শাসক কে ঈশ্বর বলা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রভুকেও ঈশ্বর শব্দের আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার কোথাও বা এই ঈশ্বর ভগবাপরমেশ্বর,… ইষ্টদেবতা বা যে কোন  বিশেষ আত্মাযা কালক্রমে ব্যক্তি ঈশ্বরের রূপ নিয়েছেন বলে পরিচিত।
শৈবধর্মে মহাদেবকেই ঈশ্বর রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে,সেই জন্যে তিনি মহেশ্বর (মহা+ঈশ্বর)বা পরমেশ্বর (পরম+ঈশ্বর)বৈষ্ণব মতে ঈশ্বর হলেন বিষ্ণু বা নারায়ণ। ব্রাহ্মবাদে যেমন ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার রূপী পরম পিতা, ঠিক তেমনি ভক্তিবাদে ঈশ্বর হলেন বহু দেব-দেবী, তিনি সাকার।
যোগ দর্শনে ঈশ্বর হলেন এক ব্যক্তিস্বরূপ অথবা আধ্যাত্মিক রূপে চিহ্নিত সত্ত্বা, সেই রূপেই তাঁর সাধনা করা হয়আবার  অদ্বৈত  বেদান্তে  ঈশ্বর হলেন গিয়ে এক অদ্বৈতবাদী সত্তা, যে জড়ের সাথে জীবের সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম।আমরা ঋগ্বেদে  ঈশ্বর  শব্দটি কিন্তু পাই নি,  তবে ঈশ্ ক্রিয়াপদটি ঋগবেদে আছে, যার অর্থ কিছু করার সক্ষমতা রাখা, যোগ্য।  ঈশ্বর শব্দটি  সামবেদঅথর্ববেদ এবং যজুর্বেদ-এর সংহিতায় ও পাওয়া যায় না। প্রাচীন ভারতীয় ব্যাকরণবিদ পাণিনির মতে   ঈশ্বর শব্দের আভিধানিক অর্থ কিন্তু আবার সৃষ্টিকর্তা বা মহান সত্তা নয় 
মহাযান বৌদ্ধধর্মে  ঈশ্বর হলেন অবলোকিতেশ্বর অর্থাৎ এমন এক মহান সত্তা,যিনি জগতের সকলের দু:খ, কষ্ট অনুভব করেন এবং সেই হিসেবে পূজনীয় তিনিই বোধিসত্ত্ব হিসেবে ভক্তগণের কাছে আরাধ্য।
সনাতন ধর্মে আরেকটি বিশেষত্ব আছে, এখানে ঈশ্বর শুধুমাত্র পুরুষই নয়, এখানে ঈশ্বর নারীরূপেও পূজিতা ইশ্বরের স্ত্রীলিঙ্গ ঈশ্বরী, যেমন দেখা যায় শাক্তধর্মে যেখানে কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা সকলেই নারী এবং সকলেই দেবীরূপে পূজিতা।
আমাদের সনাতন ধর্মে সর্বমোট  ছয়টি দর্শন, তার মধ্যে  দুইটি হল সাংখ্য এবং মীমাংসাযা  ঈশ্বরকে স্বীকার করে নাবাকি  যোগদর্শন, বৈশেষিক, বেদান্ত এবং ন্যায় নামক চারটি দর্শনে ঈশ্বর এর উল্লেখ পাওয়া যায় তবে প্রত্যেক দর্শনে ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন অর্থরূপে আলোচিত।
পতঞ্জলির যোগদর্শনে  ঈশ্বর শুধু ব্যক্তি স্রষ্টা নন, তিনি পরমাত্মা, তার প্রত্যেক জীবের উপর অলৌকিক প্রভাব রয়েছে, ঈশ্বরকে  এক বিশেষ পুরুষ রূপে চিহ্নিত। তবে পতঞ্জলির ঈশ্বর এর ধারণা আর অদ্বৈতবাদের ঈশ্বরের ধারনা কিন্তু এক নয়।
হিন্দুধর্মে একটি বিশেষ দর্শন  হল বৈশেষিকযা কণাদ এক সহস্র খ্রিস্টপূর্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই  দর্শন অনুযায়ী  পরমাণু বা বিশ্বজগৎ সৃষ্টিতে ঈশ্বরের প্রয়োজন হয় নি। এই দর্শনের মুল কথা হল পরমাণুর সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, তা শাশ্বত। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী এই পরমাণুর স্থানান্তর ঘটে, এর জন্য কোনো লৌকিক সত্তার প্রয়োজন হয় না।  এক সহস্রবছর পরে ঈশ্বর সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারণা এই বৈশেষিক দর্শনে প্রবেশ করে।  এই দর্শনের নানাবিধ বিবর্তন ঘটার পর, এই দর্শনের বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরমাণু এবং ঈশ্বর শাশ্বত। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বত্র বিরাজমান। এই মতে ঈশ্বর বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেন নি, বরং তিনি সৃষ্টি করেছেন মহাবিশ্বের অদৃশ্য নিয়ম এবং ধ্রুবক এবং এই নিয়ম গুলোর জন্য মহাবিশ্ব তার আপন নিয়মে চলতে থাকে। এবং তারপর ঈশ্বর নিষ্ক্রিয় হয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। আর মহাবিশ্ব তার আপন গতিতে চলতেই থাকে।  
অদ্বৈতবাদীর ঈশ্বর মাধ্যমিকার "আদি বুদ্ধের" ন্যায়, নাস্তিক্যবাদী নয়। হিন্দুধর্মের অন্যান্য দর্শনের ন্যায় অদ্বৈতবাদীরা আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী, কিন্তু বৌদ্ধরা আবার আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। 
ঈশোপনিষদে ঈশ্বর নিয়ে বলা হয়েছে যে  ঈশ্বর সবকিছুর উর্ধ্বে, সবকিছুর বাইরে, সবকিছু পেরিয়ে তথাপি সবকিছুর অভ্যন্তরে বিরাজমান। যে ব্যক্তি নিজেকে জানে, তাকে কখনো কারো সম্মুখে মাথা নত করার  প্রয়োজন হয় না, সে হয় ভয়শূন্য, বিভ্রান্তি মুক্ত, এবং শয়তানের কুদৃষ্টি থেকে মুক্ত সে ঠিক ঈশ্বরের মতই নির্মল, অভেদ্য, শয়তানের প্রভাব থেকে স্বাধীন
সনাতন ধর্মের দ্বৈতবাদে ঈশ্বরকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বৈতবাদে নারায়ণকে (বিষ্ণু) ঈশ্বর হিসেবে ভাবা হয়
দ্বৈতবাদীদের কাছে ঈশ্বর সম্পূর্ণ, নিখুঁত এবং উচ্চতর বাস্তবতারূপে বিদ্যমান। একই সাথে তাদের কাছে এই পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন-বাস্তবতারূপে বিদ্যমান। অর্থাৎ, লৌকিক এবং পারলৌকিক উভয়জগৎই দ্বৈতবাদীদের কাছে বাস্তব। তবে একটি জগৎ আরেকটি জগৎ থেকে আলাদা। দ্বৈতবাদে প্রতিটি জীবের আত্মা  প্রত্যেকটি জীবের জন্য স্বতন্ত্র, এবং সে আত্মা অন্য জীবের আত্মা থেকে ভিন্ন। আত্মা সবসময় মোক্ষ লাভ করতে চায়, আর এ মোক্ষ লাভের উপায় হচ্ছে আত্মার পরমাত্মার (ঈশ্বর) সাথে লীন বা একাত্ম হয়ে যাওয়া।
মাধবাচার্য জীবাত্মা এবং ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্যকে পাঁচটি উপায়ে বিন্যস্ত করেছেন। যথা: আত্মা এবং ঈশ্বর দ্বৈত, ঈশ্বর এবং বস্তুর দ্বৈত, আত্মা এবং বস্তুর দ্বৈত, একটি আত্মার সাথে অপর আত্মার মধ্যে ভিন্নতা, এবং বস্তু-বস্তুতে দ্বৈততা। এই ভিন্নতা গুণে এবং সংখ্যায় উভয়ক্ষেত্রেই বিদ্যমান  অদ্বৈতবাদে মোক্ষ যা আত্মার পরমাত্মার সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া তা  ইহকালেই লাভ করা যায়, কিন্তু দ্বৈতবাদে মোক্ষ লাভ করা যায় মৃত্যুর পরে, যদি ঈশ্বরের করুণা হয়। তবে ঈশ্বরের কৃপাভিন্ন আত্মার মোক্ষ লাভ হয় না, তাই তাকে বারবার  জন্মগ্রহণ করতে হয়, যতক্ষণ না মোক্ষলাভ হয়।
দ্বৈতবাদীদের মতে এই বিশ্বজগৎ মায়া দ্বারা আচ্ছন্ন।আত্মা তার সঠিক জ্ঞানের অভাবে ও অজ্ঞতার কারণেই কষ্ট করে, দুর্ভোগ ভোগ করে, এবং তার ফলে তৈরী হয় তার বন্ধন এই বন্ধন হয়  মোক্ষলাভ পথের বাধা। সকল কিছু ত্যাগ করে  ঈশ্বরের আরাধনা করলেই একমাত্র আত্মার মোক্ষলাভ সম্ভব বলে বিবরিত  ধার্মিক জীবনযাপন করে ইহলোকে সাত্ত্বিক কর্ম করলে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় আত্মার মুক্তি ঘটে যায় বলেই দ্বৈতবাদীরা মনে করে থাকেন।
ন্যায়শাস্ত্রের পণ্ডিতদের মতে ঈশ্বর হচ্ছেন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, অব্যর্থ, এবং এই বিশ্বচরাচর ঈশ্বরের সৃষ্টি। মানুষের কাজ যেমন, মানুষের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, ঠিক একইভাবে সৃষ্টির উপস্থিতি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বেরই প্রমাণ দেয়।তারা ঈশ্বর নিয়ে নিজেদের মতে একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। তাদের মতে ঈশ্বর হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা, যিনি আশীর্বাদ করেন, যিনি অন্নদায়ী ও মানুষের আকাঙ্খা পূর্ণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবার ন্যায় বিশেষজ্ঞরাই এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেন এবং তাদের কার্যক্রমে ক্রমেই নাস্তিক্যবাদী ভাবনা ফুটে উঠে। এর পরবর্তীতে ন্যায় শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরা পুনরায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে ক্রমাগত যুক্তি দেখিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষেই একমত হন।
মীমাংসা দর্শনের পণ্ডিতরা আবার সঠিক প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে কোনকিছুর সিদ্ধান্তে আসেন।তাই মীমাংসা বিশেষজ্ঞদের মতে  যদি ঈশ্বর এই বিশ্ব সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার প্রকাশ পেত,  কিন্তু বাস্তবে  তো মানুষ ও তার আত্মাকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়। তাই মীমাংসা বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, এই মহাজগৎ নিখুঁত নয় এবং আত্মার মোক্ষলাভের জন্য ঈশ্বরের কোনো প্রয়োজন নাই।
দ্বৈতবাদ এবং অদ্বৈতবাদ উভয় ধারণাই বিশিষ্টাদ্বৈতবাদিতার ঈশ্বরের মধ্যে দেখা যায়। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বিশেষজ্ঞ রামানুজ ঈশ্বর সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ঈশ্বর ব্রহ্মের মতই এই সমগ্র বিশ্বচরাচরের সৃষ্টিকর্তা।তিনিই পরম কারণ, তিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে বিস্তৃত।বিশিষ্টাদ্বৈতবাদীদের মতে ঈশ্বর পঞ্চরূপে বিস্তৃত হতে পারেন, তিনি মহাবিশ্বজুড়ে অবস্থান করেন। অবতাররূপে পৃথিবীতে অবস্থান করতে পারেন, জলের প্রবাহে অবস্থান করেন, সকল জীবের অভ্যন্তরে অবস্থান করেন এবং বিগ্রহের অভ্যন্তরে অবস্থান করেন। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বিশেষজ্ঞদের কাছে শ্রীবিষ্ণু অথবা তার অবতারই হলেন ঈশ্বর। 
আবার অচিন্ত্য ভেদ-অভেদ (অচিন্ত্য শব্দের অর্থ হচ্ছে, চিন্তা করা যায় না এমন; অর্থাৎ ধারণাতীত। "ভেদ" শব্দের অর্থ হচ্ছে পার্থক্য, আর অভেদ শব্দের অর্থ হচ্ছে এক)  দর্শনে সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মধ্যে সম্পর্ক থাকে এবং এই দর্শনের ঈশ্বর হলেন শ্রীকৃষ্ণ
 চার্বাক  দর্শনের অনুসারীরা বস্তুবাদী এবং এই দর্শনের মূলকথা হল, তাকেই বিশ্বাস করা উচিত, যার পিছনে যুক্তি আছে। তারা অতিপ্রাকৃত ঈশ্বর সংক্রান্ত সকল মতবাদকেই তারা খারিজ করে দিয়েছিলেন। 

( বিভিন্ন তথ্যসুত্র থেকে সঙ্কলিত)

কৌশিকী অমাবস্যা

  ছবি  কৃতজ্ঞতাঃ- গুগল চিত্র পুরাণমতে, কৌশিকী অমাবস্যার শুভতিথিতে পরাক্রমশালী শুভ-নিশুম্ভ অসুর দুই ভাইকে বধ করার সময়েই দেবী পার্বতীর দেহের ...